কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মাসুদ পারভেজ খান ইমরান ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী হওয়ায় তৃণমূলের নেতাকর্মীরা ‘দুঃশ্চিন্তায়’ পড়লেও মেয়র পদে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আরফানুল হক রিফাত এ বিষয়কে ‘কিছুই মনে করছেন না’।

কুমিল্লায় আওয়ামী লীগের রাজনীতি বরাবরই দুটি বলয়ে বিভক্ত; এক অংশের নেতৃত্ব দিয়েছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা আফজল খান, অপরপক্ষে আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহার।

ইমরান বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর প্রয়াত আফজল খানের ছেলে; আর রিফাত কুমিল্লা মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও কুমিল্লা সদর আসনের সংসদ সদস্য বাহাউদ্দিন বাহারের অনুসারী হিসেবে পরিচিত।

গত দুটি নির্বাচনে আফজল খানের পরিবার থেকেই মেয়র পদে প্রার্থী দিয়েছে আওয়ামী লীগ। দুবারই জিতেছেন বিএনপির মনিরুল হক সাক্কু।

এবার আওয়ামী লীগ নৌকার বৈঠা তুলে দিয়েছে কুমিল্লা মহানগরের সাধারণ সম্পাদক রিফাতের হাতে। কিন্তু শেষ মুহূর্তে এসে আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা উপ কমিটির সদস্য ইমরান মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ায় ভোটের মাঠে শুরু হয়েছে নানা হিসাব-নিকাশ।

২৬ মে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ তারিখ; ইমরান বলছেন, ‘যত কিছুর বিনিময়ে হোক’, শেষ পর্যন্ত তিনি মাঠে থাকবেন।

কুমিল্লা চেম্বার অব কমার্সের এই সভাপতি বলেন, “আমি দীর্ঘদিন ধরে কুমিল্লা নগরীর মানুষের সঙ্গে আছি। বাবার আদর্শে জনগণের সুখে-দুঃখে পাশে থেকেছি। গত দুই নির্বাচনে ষড়যন্ত্রের কারণে আমার বাবা ও বোন জয়ী হতে পারেননি। এবার আমি দলের মনোনয়ন চেয়েছি, শেষ পর্যন্ত দল অন্য প্রার্থীকে মনোনয়ন দিয়েছে।

“সে কারণে এবার আমার নির্বাচন করার কোনো ইচ্ছাই ছিল না। কিন্তু আমার নেতাকর্মী ও নগরীর মানুষ আমাকে শেষ পর্যায়ে এসে এমনভাবে ধরেছে যে, আমি তাদের কথা আর ফেলতে পারিনি। যার কারণে অনেকটা বাধ্য হয়েই একেবারে শেষ সময়ে এসে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।”

ইমরান বলেন, “কুমিল্লা নগরীর মানুষ এখন পরিবর্তন চায়। তবে আওয়ামী লীগ নেতা হিসেবে নয়, একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবেই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছি।… আশা করছি, মানুষ আমাকেই তাদের মেয়র হিসেবে বেছে নেবে। আমি নির্বাচনে জয়ী হয়ে সুষ্ঠু পরিকল্পনার মাধ্যমে কুমিল্লাকে একটি মডেল নগরীতে পরিণত করতে চাই।”

আওয়ামী লীগের প্রার্থী আরফানুল হক রিফাত বলছেন, শেষ মুহূর্তে ইমরান প্রার্থী হওয়ায় তিনি ‘অবাক হননি’।

“গত দুটি নির্বাচনে নেত্রী (প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা) আফজল খানের পরিবারকে মূল্যায়ন করেছেন। মাঠে জনপ্রিয়তা না থাকায় তারা জয়ী হতে পারেননি। এরপরও নেত্রী আঞ্জুম সুলতানা সীমাকে সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য করে তাদের পরিবারকে মূল্যায়ন করেছেন। কিন্তু এরপরও তারা বদলাননি।

“ইমরানের প্রার্থী হওয়াতে আমি মোটেও অবাক হইনি। কারণ ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনেও তিনি আমাদের রাজনৈতিক অভিভাবক আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহার এমপির বিরুদ্ধে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়ে পরাজিত হয়েছেন। এজন্য আমি এসবকে কিছুই মনে করছি না।”

আওয়ামী লীগের তৃণমূলের প্রতিটি স্তরের নেতাকর্মীরা ‘ঐক্যবদ্ধ’ দাবি করে নৌকার প্রার্থী রিফাত বলেন, “আশা করছি, কুমিল্লার মানুষ আমাকেই ১৫ জুনের নির্বাচনে বেছে নেবে। আমি মেয়র না, মানুষের সেবক হতে চাই। নেত্রীকে নৌকার বিজয় উপহার দিতে চাই।

“ষড়যন্ত্র করে নৌকার বিজয় ঠেকানো যাবে না। এরপরও বলব, ইমরানের শুভবুদ্ধির উদয় হোক, তিনি নৌকা ও আওয়ামী লীগের স্বার্থে ২৬ তারিখের মধ্যে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াবেন।”

২০১২ সালের প্রথম সিটি নির্বাচনে মেয়র পদে লড়েছিলেন আফজল খান নিজে। সেবার তিনি বিএনপি নেতা মনিরুল হক সাক্কুর কাছে হেরে যান। সাক্কু ৬৫ হাজার ৫৭৭ ভোট পেয়ে জয়লাভ করেন। আফজল খান পান ৩৬ হাজার ৪৭১ ভোট।

এরপর ২০১৭ সালে মেয়র পদে প্রার্থী হন আফজল খানের মেয়ে কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি আঞ্জুম সুলতানা সীমা। সে নির্বাচনেও সাক্কু ধানের শীষ প্রতীকে ৬৮ হাজার ৯৪৮ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। নৌকা প্রতীক নিয়ে সীমা পান ৫৭ হাজার ৮৬৩ ভোট।

এ দুটি নির্বাচনে দলীয় ‘বিভেদের প্রভাব’ পড়েছিল বলে মনে করেন তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। এরপর গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুমিল্লা সদর আসনে আওয়ামী লীগ বাহাউদ্দিন বাহারকে মনোনয়ন দিলে তার বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র প্রার্থী হন আফজল খানের ছেলে ইমরান। সেই নির্বাচনে জয়ী হন বাহার।

দীর্ঘদিনের এই দলীয় বিভেদ এবারের সিটি করপোরেশনের নির্বাচনেও পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। তাদের ধারণা, এর নিরসন না হলে সিটি করপোরেশন জয় করা কঠিন হবে এবং ‘পুরনো সংকটের বৃত্তেই’ আটকে থাকবে দল। যার সুবিধা নেবে তৃতীয় কোনো প্রার্থী।

আবুল কালাম, জাহাঙ্গীর আলম ও জামাল হোসেন- তিনজনই স্থানীয়ভাবে আওয়ামী লীগের কর্মী হিসেবে পরিচিত। কোনো পদ-পদবী না থাকলেও তারা দলের জন্য নিবেদিত।

তাদের মত হচ্ছে, আওয়ামী লীগ দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রের ক্ষমতায় আছে। এরপরও দলীয় কোন্দলের কারণে কুমিল্লার মেয়রের চেয়ারে এখন পর্যন্ত আওয়ামী লীগের কেউ বসতে পারেনি।

আবুল কালাম বলেন, “তৃণমূলের নেতাকর্মীরা চায় এবার পরিবর্তন হোক, নৌকার প্রার্থীই মেয়রের চেয়ারে বসুক। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পুরনো রাজনৈতিক বিরোধ আবারও প্রকাশ্যে এসেছে। এই অবস্থায় সব বাধা ডিঙিয়ে নৌকার প্রার্থীর মেয়র হওয়া খুবই চ্যালেঞ্জিং ব্যাপার।”

জামাল হোসেন বলেন, “এখনি এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নিতে হবে।”

বিষয়টি নিয়ে মহানগর আওয়ামী লীগের অন্তত তিনজন নেতার সঙ্গে কথা বলেছে। কিন্তু কেউ নাম প্রকাশ করে এ নিয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।

তাদের একজন বলেন, “ইমরান খানের পরিবার আওয়ামী লীগের। তিনি যত ভোটই পাবেন সেগুলো আওয়ামী লীগের ভোটই পাবেন। কুমিল্লা আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে তার বাবা আফজল খানের একটি প্রভাব ছিল। পারিবারিক ঐতিহ্যের কারণেও তিনি বেশ কিছু ভোট পাবেন।”

আরেকজন বলেন, “ইমরানকে দুর্বল ভাবার কোনো সুযোগ নেই। দুজন প্রার্থীর দ্বন্দ্বে শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। নির্বাচনে বিজয়ী হতে হলে এই মুহূর্তে রিফাতের উচিত ইমরানকে থামানো। বলতে গেলে, এটাই রিফাতের এখন বড় চ্যালেঞ্জ। ইমরান এখন রিফাতের গলার কাঁটা।”

আওয়ামী লীগের মত বিএনপির দুই নেতাও এবার মেয়র পদের লড়াইয়ে আছেন। একজন গত দুইবারের মেয়র মো. মনিরুল হক সাক্কু; তিনি কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন। অন্যজন নিজাম উদ্দিন কায়সার। তিনি ছিলেন কুমিল্লা মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি। দলের মতের বিরুদ্ধে নির্বাচনে অংশ নেওয়ায় দুজনকেই দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

মেয়র পদে অপর দুই প্রার্থী হলেন- ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের রাশেদুল ইসলাম এবং রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী ও কুমিল্লা নাগরিক ফোরামের সভাপতি কামরুল আহসান।

ইউটিউবে আমাদের চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন: