মো. জাকির হোসেনঃ কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার পারুয়ারা আবদুল মতিন খসরু কলেজের একাদশ শ্রেণির প্রথম বর্ষের ছাত্র আহম্মদ উল্লাহ (১৭) এর মৃত্যু নিয়ে পরস্পর বিরোধী বক্তব্য দিচ্ছে কলেজ ও দুই পরিবারের লোকজন। এদিকে মৃত্যুর কারন নিয়ে নানাহ প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বুধবার দুপুরে নিহতের মামার বাড়ী উপজেলার আবিদপুর গ্রাম থেকে লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ।

নিহত আহম্মদ উল্লাহর পরিবারের সাথে কথা বলে জানা যায়, দেবিদ্বার উপজেলার মোহনপুর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এবারের এস এস সি পরীক্ষায় আহম্মদ উল্লাহ জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়ে বুড়িচং উপজেলার পারুয়ারা আবদুল মতিন খসরু কলেজে একাদশ শ্রেণিতে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয়। ১ জুলাই থেকে কলেজের ক্লাস আরম্ভ হয়। প্রথম ১৫ দিন সে নিজ বাড়ী থেকে এসে ক্লাস করতো। বাড়ী থেকে কলেজের দুরত্ব বেশি হওয়ায় ১৫ জুলাই সে বুড়িচং উপজেলার মোকাম ইউনিয়নের আবিদপুর গ্রামের মামার বাড়ীতে চলে আসে। মামার বাড়ীতে থেকে সে কলেজে আসা-যাওয়া করতো। ঈদের ছুটি শেষে কলেজ চালু হলে গত ২৪ আগষ্ট সে আবারো মামার বাড়ীতে আসে, ২৮ আগষ্ট তার মৃত্যু হয়।

নিহতের বড় ভাই মোঃ আলী জানান, ২৮ অগাষ্ট সকাল সাড়ে ৮ টায় তাঁর মামাতো বোন ফোন দিয়ে জানান, আহম্মদ উল্লাহ গলায় ফাঁস দিয়েছে, তাঁকে হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। আমরা গিয়ে আহম্মদ উল্লাহর মরদেহ দেখতে পাই। মোঃ আলী আরো জানান, আমার ভাইকে পরিকল্পিত ভাবে হত্যা করা হয়েছে। ভাইয়ের শরীরে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। আমার মামী (সালমা বেগম) আমার ভাইকে পছন্দ করতো না। আমার ভাই তাদের বাড়ীতে থাকা নিয়ে অনেক ঝামেলা হয়েছে। আমার ভাইয়ের হত্যাকারীদের বিচার চাই।

এদিকে আহম্মদ উল্লাহর মামার বাড়ীতে গেলে মামী সালমা বেগম জানান, আমার স্বামী মোঃ হোসেন ওমান থেকে ঈদের পূর্বে ছুটিতে এসে এক সপ্তাহ পূর্বে বিদেশে চলে যায়। আমার স্বামী থাকা কালীন আহম্মদ উল্লাহ আমাদের বাড়ীতে আসে। আহম্মদ উল্লাহ আর আমার ছেলে আঃ আলীম এক রুমে থাকতো। আমি তাঁকে নিজের ছেলের মতোই দেখাশুনা করতাম। ঘটনার দিন সকালে আহম্মদ উল্লাহ গোসল করে কলেজের প্রস্তুতি নেয়। আমি রান্না করে খাবার খাওয়ার জন্য তাঁকে ডাকতে গিয়ে ঘরের দরজা বন্ধ পাই। অনেক্ষন ডাকা-ডাকি করার পরও দরজা না খোলায় আমার ছেলে ঘরের পেছনে গিয়ে বাথরুমের গ্রিলের সাথে (ফ্যান লাইট) গামছা ঝুলানো দেখতে পেয়ে চিৎকার দিলে স্থানীয় লোকজন এগিয়ে আসে। পরে ছুরি দিয়ে গামছা কেঁটে বাড়ীর পুরুষ লোকজন দরজা ভেঙ্গে তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। নিহতের মামী আরো জানান, আহম্মদ উল্লাহ অত্যান্ত ভালো ছেলে ছিলো, সে ৫ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করতো, কারো সাথে তাঁর কোন প্রকার মনোমালন্য ছিলোনা।

মরদেহ বাড়ীতে নিয়ে আসলে খবর পেয়ে দেবপুর ফাঁড়ী পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। পুলিশ নিহতের সুরতহাল রিপোর্ট তৈরী করার সময় নিহতের লুঙ্গীর গোছের মধ্যে একটি চিরকুট পায়। চিরকুটের এক অংশে লিখা আছে আমার মৃত্যুর জন্য স্বরণ স্যার দায়ী। স্বরন স্যার হলো নিহত আহম্মদ উল্লাহর কলেজের পদার্থ বিজ্ঞানের শিক্ষক।

এ বিষয়ে পারুয়ারা আবদুল মতিন খসরু কলেজের অধ্যক্ষ আবু ইউসুফ ভূইয়া বলেন, জুলাইয়ের ১ তারিখ থেকে একাদশ শ্রেণির ক্লাস আরম্ভ হয়েছে। ৮ তারিখ থেকে ২৩ তারিখ পর্যন্ত ঈদের ছুটি ছিলো, ২৪ তারিখ থেকে ক্লাস আরম্ভ হয়। সর্বমোট একাদশ শ্রেণির ৩১ দিন ক্লাস হয়েছে। একাদশ শ্রেণিতে এবার ১৬০ জন শিক্ষার্থী আছে। শিক্ষকরা এখনো সকল শিক্ষার্থীদের সাথে ভালো ভাবে পরিচিত হয়ে উঠতে পারেনি। নিহত আহম্মদ উল্লাহ মৃত্যুর আগের দিনও কলেজে এসেছিল। শিক্ষকের সাথে কিংবা ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে কোন প্রকার ঝামেলার খবর আমি শুনিনি।

পদার্থ বিজ্ঞানের শিক্ষক আবুল হোসেন সরন বলেন, আমি আহাম্মদ উল্লাহর সাথে এখনো পরিচিত হইনি। তাঁর সাথে আমার কোন প্রকার কথোপকথনও হয়নি। আমি এ বিষয়ে কিছুই জানি না।

নিহত আহম্মদ উল্লাহর স্কুল ও কলেজ জীবনের বন্ধু রাকিবলু ইসলাম বলেন, ১ম শ্রেণি থেকে অদ্যবদী আমি আর আহম্মদ এক সাথে লেখাপড়া করে আসছি। আহম্মদ ও আমি দু’জনেই এক সাথে এস.এস.সি পরীক্ষা দিয়ে উভয়েই জিপিএ- ৫ পেয়েছি। সে অত্যান্ত মেধাবী ছাত্র ছিলো, আহম্মদ আত্মহত্যা করতে পারে না। শিক্ষক-কিংবা শিক্ষার্থীদের সাথে কোন মনমালোন্য হয়েছে কিনা এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাকিবুল বলেন, ক্লাসে বাড়ীর কাজ না করে আনলে শিক্ষক ছাত্রদের শাস্তি দেন। তবে আহম্মদ ভালো ছাত্র বিধায় সে নিয়মিত বাড়ীর পড়া শেষ করে আনতো। কলেজের কারো সাথে আহম্মদের কোন ঝামেলা হয়নি।

এ বিষয়ে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা দেবপুর পুলিশ ফাঁড়ীর এস আই কামাল হোসেন জানান, নিহতের সাথে পওয়া চিরকুট তাঁর হাতের লিখা কিনা প্রমানের জন্য তাঁর ব্যবহৃত খাতা, কলেজের ভর্তি ফরম আদালতের মাধ্যমে সিআইডিতে প্রেরণ করা হয়েছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্টের পর মৃত্যুর সঠিক কারন জানা যাবে।

ইউটিউবে আমাদের চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন: