বিল্লাল হোসেন রাজুঃ তীব্র শীতে কুমিল্লায় ডায়রিয়া ও নিউমোনিয়া আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। গত এক সপ্তাহের এ রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে প্রায় তিন শতাধিক রোগী। এদের বেশির ভাগই শিশু।

সদর হাসপাতালের ডায়রিয়া ওয়ার্ডের ৬টি সিটের মধ্যে বর্তমানে ভর্তি আছে ১৩জন রোগী। তাছাড়া প্রতিদিন ২০ থেতে ২৫জন রোগী বহিঃ বিভাগে চিকিৎসা নিচ্ছেন। গত কয়েক বছরের তুলনায় নিউমোনিয়া আক্রান্তের সংখ্যা অনেকটা কম। তবে ডায়রিয়া আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে । এ তথ্য জানিয়েছেন কুমিল্লা মহানগীরর সদর হাসপাতালের ডা. মহসিন।

এ ছাড়া জেলা সদর হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে স্থান সংকুলান না হওয়ায় প্রতিটি বেডে দু’জন, এমনকি ফোরেও রোগী ভর্তি দেয়া হচ্ছে। শীত বাড়ার সাথে সাথে রোঠা ভাইরাসের প্রভাবে রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। অন্যদিকে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সংক্রামণ বিভাগে গত দেড় মাসে ডায়রিয়া রোগে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছেন ২শ ৬৩জন।

কুমিল্লা জেলা সিভিল সার্জন ডা. মজিবুর রহমান জানান, হাসপাতালে পর্যাপ্ত ওষুধ সরবরাহ রয়েছে। রোগীদের যথাসাধ্য চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। আমরা সব শিশুদের সফলভাবে চিকিৎসা দিচ্ছি, এ পর্যন্ত সদর হাসপাতালে ঠান্ডাজনিত রোগে কোনো শিশুর মৃত্যু হয়নি।

এদিকে রোগীর স্বজনরা অভিযোগ করে জানান, মহানগরীর সদর হাসপাতাল ছাড়া উপজেলা কমপ্লেক্স হাসপাতালগুলোতে রোগীদের তেমন কোনো ওষুধ দেয়া হয় না। নেই কোনো চিকিৎসক। বাইরে থেকে ওষুধ কিনতে হয়। ওষুধ বা চিকিৎসার কথা বললে রোগীর স্বজনদের সাথে খারাপ আচরণ করে চিকিৎসক ও নার্সরা। তারা বলে এখানে কোনো চিকিৎসা হবে না। অন্যত্র চিকিৎসার করানোর জন্য বলেন তারা। ফলে অসহায় ও দুস্থ রোগীদের অন্যত্র চিকিৎসা নিতে কষ্ট হয়।

এ ছাড়া সদর হাসপাতালের টয়লেট, খাবার পানি ও রুমের অবস্থা সবচেয়ে নোংরা। এ নোংরা পরিবেশের কারণে আরো বেশি অসুস্থ হয়ে পড়েছেন রোগী ও রোগীর স্বজনরা। সেবার মান উন্নত করতে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থার দাবি জানান গরীব অসহায় রোগীর স্বজনরা।

গেল বৈশাখের শুর থেকেই সারা দেশের মতো কুমিল্লায়ও ছিলো তীব্র তাপদাহ। মাঝে মাঝে হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হয়ে চলতো টানা কয়েক দিন। তীব্র তাপদাহ আর অঝোর বৃষ্টিতে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলো কুমিল্লার সব শ্রেণির পেশার মানুষ। প্রকৃতির এ বৈরী আচরনের বেড়েছে  নানা রোগব্যাধী। কুমিল্লার সব উপজেলা সদর হাসপাতালগুলোতে বছর জুড়ে ছিলো রোগীর উপচে পড়া ভীড়। সিভিল সার্জন অফিসের তথ্য অনুযায়ী ২০১৭ সালে সবচেয়ে বেশি ভর্তি হয়েছে ডায়রিয়া বা কলেরায় আক্রান্ত রোগী।

জেলা সিভিল সার্জন অফিসের পরিসংখ্যানবিদ মোঃ জাহাঙ্গীর আলমের দেওয়া তথ্য থেকে জানা যায়, কুমিল্লা জেলায় ১৭ সালের জানুয়ারী থেকে নভেম্বর মাসে ডায়রিয়া রোগে আক্রান্ত হয়ে সেবা নিয়েছে ৭৯ হাজার ৭শ ৭৭জন । এদিকে ২০১৬  সালের সর্বশেষ রির্পোট অনুযায়ী কুমিল্লা জেলায় ডায়রিয়া রোগে আক্রান্ত হয়েছিলো ২০ হাজার ৭শ ৩১ জন। ওই হিসেবে শুধু ২০১৭ সালে ডায়রিয়া রোগী বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ৫০ হাজার। ২০১৭ সালে সবচেয়ে বেশি ডায়রিয়া রোগে আক্রান্ত হয়েছে দেবিদ্বার উপজেলার ১০ হাজার ২শ ৩৫জন মানুষ সেবা নিয়েছে।

উল্লেখ্য যে প্রতি বছর ডায়রিয়ার কারণে পানিশূন্যতা ও অপুষ্টির ফলে দশ লাখেরও বেশি শিশুর মৃত্যু হয়। ডায়রিয়াতে প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় শিশুদের মৃত্যুর সম্ভাবনা বেশি কারণ তারা বেশি তাড়াতাড়ি পানিশূন্য হয়ে পড়ে। ডায়রিয়া আক্রান্ত প্রতি ২০০ শিশুর মধ্যে প্রায় একজন মারা যায়।

সাধারণত ডায়রিয়ায় বেশি আক্রান্ত হচ্ছে নিম্নবিত্ত শ্রেণির মানুষ। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, নিম্নআয়ের মানুষের এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার ক্ষেত্রে অসচেতনতা একটি বড় বিষয়। তারা আরো বলছেন, সরকারি চিকিৎসালয় নিয়ে আছে বিস্তর অভিযোগ। অথচ সাধারণ মানুষের, বিশেষ করে নিম্নমধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্তের কাছে সরকারি হাসপাতালগুলোই ভরসাস্থল। কেননা বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় গড়ে ওঠা চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোতে নিম্নবিত্তদের পক্ষে চিকিৎসাসেবা গ্রহণ প্রায় অসম্ভব। কাজেই এই বিষয়গুলোকে আমলে নিয়ে যথাযথ দৃষ্টি রাখতে হবে এবং একই সঙ্গে প্রতিটি সরকারি হাসপাতালে রোগী ভর্তিসহ চিকিৎসার সব রকম ব্যবস্থা সহজ ও স্বচ্ছ হওয়া প্রয়োজন।

ইউটিউবে আমাদের চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন: