তেজগাঁওয়ের টাইমস মিডিয়া ভবনের মাল্টিপারপাস হলে শুক্রবার বিকেলের দৃশ্যটা ছিল অন্যরকম। যুক্তির শানিত তীর ছুড়ে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার তীব্র প্রতিযোগিতায় মেতেছিল বরিশাল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কুমিল্লার নবাব ফয়জুন্নেছা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় দলের মেধাবী বিতার্কিকরা। ‘বিজ্ঞানমুখী শিক্ষাই পারে সাম্প্রদায়িকতামুক্ত সমাজ গড়তে’ শীর্ষক প্রস্তাবের পক্ষে এবং বিপক্ষে দলগুলোর যুক্তি ও পাল্টা যুক্তির রসাস্বাদনে মুগ্ধ দর্শকদের মুহুর্মুহু করতালিতে পুরো মিলনায়তনজুড়ে তখন উচ্ছ্বাসের ঝিলিক। মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছিলেন সবাই। মঞ্চের সামনে বসা বিশিষ্টজনও বারবার করতালিতে মুখর করে তোলেন অনুষ্ঠানস্থল। নতুন প্রজন্মের মধ্য দিয়েই তারা দেখছিলেন আগামী দিনের যুক্তিনির্ভর, গণতান্ত্রিক, মননশীল ও সৃজনশীল জাতি গড়ে ওঠার প্রচেষ্টা। শেষ দিনের তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এ বিতর্কের মধ্য দিয়েই পর্দা নামল ‘বিএফএফ-সমকাল জাতীয় বিজ্ঞান বিতর্ক উৎসব-২০২১’-এর চূড়ান্ত আসরের। সমকাল ও বাংলাদেশ ফ্রিডম ফাউন্ডেশনের (বিএফএফ) উদ্যোগে সমকাল সুহৃদ সমাবেশ এ উৎসবের আয়োজন করে।

এবার সারাদেশের ৬৪টি জেলার ৫২০টি স্কুলের মধ্যে অনুষ্ঠিত এ প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হয়ে চ্যাম্পিয়ন হিসেবে শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট মাথায় পরেছেন কুমিল্লার নবাব ফয়জুন্নেছা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের বিতার্কিকরা। এ দলের দলনেতা সালফিয়া তানহিয়াত নুজাইমা সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে অর্জন করেছেন শ্রেষ্ঠ বক্তার সম্মান। রানার্সআপ হয়েছে বরিশাল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় দল। দুই সেমিফাইনালিস্ট হয়েছে বগুড়ার বিয়াম মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ দল এবং চাঁদপুর আল আমিন স্কুল অ্যান্ড কলেজ দল। তারা গতকাল অতিথিদের হাত থেকে পুরস্কার গ্রহণ করেন। সারাদেশের ৯টি অঞ্চলের প্রায় দুই হাজার ছাত্রছাত্রী এবারের এ প্রতিযোগিতায় অংশ নেন।

চ্যাম্পিয়ন দল পেয়েছে চাম্পিয়ন সম্মাননা স্মারক। এ দলের প্রত্যেক বিতার্কিক পেয়েছেন ল্যাপটপ, বই, ক্রেস্ট আর সনদপত্র। রানার্সআপ দলের তার্কিকদের দেওয়া হয় নেটবুক, বই, ক্রেস্ট আর সনদপত্র। দুই সেমিফাইনালিস্ট দলের প্রত্যেকে পেয়েছেন স্মার্টফোন, বই, ক্রেস্ট আর সনদপত্র। বিতর্কের চূড়ান্ত আসরের বিচারক ছিলেন দেবাশিষ রঞ্জন সরকার, মাজেদ আজাদ, নাজমুল হুদা সুমন, নিশাত সুলতানা ও আবদুল্লাহ চৌধুরী মামুন।

অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি এক সময়ের কৃতী বিতার্কিক শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি অনলাইনে যুক্ত হয়ে এ বিতর্কে অংশগ্রহণকারী সব শিক্ষার্থীকে শুভাশিস জানিয়ে বলেন, বিতর্ক মানুষকে সাহসী, আত্মবিশ্বাসী ও যুক্তিবাদী করে তোলে। এর মাধ্যমে শব্দ চয়ন, বাক্য গঠন, ভাষার ব্যবহার ও সুন্দরভারে বক্তব্য উপস্থাপন করার দক্ষতা বাড়ে। বিতর্ক যুক্তিকে শানিত করে। বিতার্কিকের জ্ঞানের পরিধি বাড়িয়ে দেয়। একটা বিষয়কে নানা দিক থেকে দেখার সুযোগ করে দেয়, যা পরমতসহিষ্ণুতা শেখায়। আজকে আমাদের সমাজে অসহিষ্ণুতা বেশি। বিতর্ক চিন্তার পথকে বহুদূর পর্যন্ত প্রসারিত করে। এই চর্চা আমাদের দেশে একটি উদার, গণতান্ত্রিক ও মুক্তমনা সমাজ গড়ে তুলবে।

অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. শহীদুর রশীদ ভূঁইয়া বলেন, আমাদের ছেলেবেলায় সব স্কুলে বিজ্ঞান পড়ানো হতো না। কষ্ট করে নদী পাড়ি দিয়ে দূরের স্কুলে গিয়ে বিজ্ঞান পড়েছি। সেখানে কোনো ল্যাবরেটরি ছিল না। হাতে-কলমে বিজ্ঞান শিখেছি শহরে এসে কলেজ পর্যায়ে। আমরা চাই গ্রামে-গঞ্জে যত স্কুল-কলেজ রয়েছে, সবখানে যেন আমাদের শিক্ষার্থীরা হাতে-কলমে বিজ্ঞান শিখতে পারে। তিনি বলেন, এই বিতর্কে চূড়ান্ত পর্বে অংশ নেওয়া সব বিতার্কিকই নারী। কৃষি শিক্ষায় প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থী নারী। তারা সর্বত্র এগিয়ে আসছে। তিনি বলেন, বিজ্ঞান প্রতিনিয়ত আমাদের সঙ্গে আছে, নেই কেবল বিজ্ঞানের চর্চা।

সভাপতির বক্তব্যে সমকালের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মুস্তাফিজ শফি বলেন, আমরা বিজ্ঞানমনস্ক, উদার, গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই। আর এই প্রজন্মই তা পারবে। তারা বিজ্ঞানকে, পুরো পুথিবীকে হাতের মুঠোয় নিয়ে ঘোরে। তিনি বলেন, বিজ্ঞানমনস্ক সমাজ ও জাতি গড়ে তোলার জন্য আট বছর ধরে সমকাল বিজ্ঞান বিতর্ক প্রতিযোগিতার আয়োজন করে আসছে। এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বিতর্ক প্রতিযোগিতা। আজকের এই আলোকিত ছাত্রীরাই পারবে তাদের স্কুলকে, সমাজকে বদলে দিতে। যা তারা শিখেছে, যা বলেছে, তা যেন তারা বুকের ভেতরে ধারণ করে। আমরা শুধু কয়েকজন বিজ্ঞানী তৈরি করতে চাই না, পুরো সমাজকেই বিজ্ঞানমনস্ক করে গড়ে তুলতে চাই।

ইউটিউবে আমাদের চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন: