কুমিল্লা মহানগরের ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দার পাসপোর্টের মেয়াদ প্রায় শেষ। তবে তিনি আবেদনই করতে পারছেন না। কারণ, স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলরের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সত্যায়িত করতে পারছেন না।

ওয়ার্ড কাউন্সিলর আবুল হাসানকে না পাওয়ার কারণ, তিনি একটি হত্যা মামলায় কারাগারে।

আবদুল হান্নান বলেন, ‘আইজ সাড়ে চাইর মাস কাউন্সিলর সাব নাই। পাসপোট রেনুর (রিনিউ করার জন্য) সত্যাইয়োতোর লাইগ্যা ঘুরতাছি। আমার মতো বহুত মানুষ কাউন্সিলর অফিসে যায় আর আসে। কিতা করব কন।’

এই অবস্থা নগরীর আরও চারটি ওয়ার্ডে। এর মধ্যে তিনটি ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নানা মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে। আর একজন হঠাৎ উধাও হয়ে গেছেন।

তবে সিটি মেয়র বিএনপি নেতা মনিরুল হক সাক্কুর আশ্বাস, সেবা নির্বিঘ্নে চালিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা তিনি করছেন। তিনি জানিয়েছেন, কাউন্সিলর অনুপস্থিত থাকায় সচিবকে বাড়তি দায়িত্ব দিয়েছেন। তবে নাগরিকরা বলছেন, এতে কাজ হচ্ছে না।

নগরের চাঙ্গিনী এলাকায় গত ১০ জুলাই দুপুরে আওয়ামী লীগ কর্মী আক্তার হোসেনকে মসজিদের সামনে লোহার রড দিয়ে পিটিয়ে ও দা দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।

এ ঘটনায় নিহতের স্ত্রী রেখা বেগম ওই রাতেই সদর দক্ষিণ মডেল থানায় ২৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আলমগীর হোসেনকে প্রধান আসামি করে ১০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন।

এ মামলায় আগাম জামিন শেষে কুমিল্লার আদালতে হাজির হলে আদালত আলমগীরকে কারাগারে পাঠায়।

নগরীর চৌয়ারা এলাকায় গত ১১ নভেম্বর যুবলীগ কর্মী জিল্লুর রহমান চৌধুরীকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। পরদিন তার ভাই ইমরান হোসেন চৌধুরী সদর দক্ষিণ থানায় ২৪ জনের নামে মামলা করেন। প্রধান আসামি করা হয় ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আবুল হাসানকে।

মামলার পর উচ্চ আদালত থেকে চার সপ্তাহের আগাম জামিন নেন আবুল হাসান। এরপর জেলা ও দায়রা জজ মো. আতাবুল্লাহর আদালতে হাজির হয়ে জামিনের আবেদন করেন তিনি। আদালত তাকে জামিন না দিয়ে কারাগারে পাঠায়।

এই হত্যা মামলার ২ নম্বর আসামি হলেন ২৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আবদুস সাত্তার।

রাজধানীর শাহবাগ থেকে গত ২৬ জানুয়ারি তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন, পিবিআই। তিনিও এখন কারাগারে।

১৯ মার্চ যুবলীগ নেতা রোকন উদ্দিনকে গাড়িচাপা দিয়ে হত্যাচেষ্টার মামলায় কারাগারে যান ১৫ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর সাইফুল বিন জলিল।

নগরীর ছাতিপট্টি এলাকায় সেদিন যুবলীগের মিছিলে গাড়ি তুলে দেন জলিল। তাতে চাপা পড়ে আহত হন রোকন।

এই ঘটনার ভাইরাল হওয়া সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যায়, দেশীয় অস্ত্র হাতে জলিল কাউকে ধাওয়া করছেন। পুলিশ তাকে ধরতে গেলে বেশ কিছু সময় ধস্তাধস্তি হয়। এরপর তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

নগরীর ১ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর গোলাম কিবরিয়া প্রায় এক মাস ধরে এলাকায় নেই।

তিনি কোথায় আছেন জানতে চাইলে মেয়র বলেন, ‘সন্তানের চিকিৎসার জন্য তিনি সুইডেন গিয়েছিলেন বলে জানতাম। কিছুদিন আগে তিনি দেশেও এসেছেন বলে জেনেছি। পরে আর খোঁজ নেই।’

একটি মামলায় রাজধানীতে তিনি পুলিশের হাতে আটক হয়েছেন বলে কুমিল্লায় গুঞ্জন আছে। যদিও এই বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এখনও নিশ্চিত করেনি।

মেয়র সাক্কু বলেন, ‘আমিও শুনেছি। তবে নিশ্চিত নই। কারণ টানা তিনটি সভায় না আসলে আমরা সিটি করপোরেশন থেকে চিঠি দেই। জানার চেষ্টা করি কোথায় আছেন।’

জনপ্রতিনিধিদের এমন পরিস্থিতিতে ক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষ, দেখা দিয়েছে আস্থাহীনতা।

২৬ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা আবদুল মতিন বলেন, ‘আমার নাতির জন্মনিবন্ধনের লাইগ্যা ঘুরতে আছি। কাউন্সিলর নাই। হুনছি মেয়রের কাছে গেলে কাম হইব। কাউলকা গেছিলাম সিটি করপোরেশনে। মাইনষে কইলো মেয়র সাব ঢাকা। কাইল পরশু যাওনের লাইগ্যা। যে রইদ (রোদ) পড়ে। যাওন আহনডা আর ভালা লাগে না।’

প্রায় ৯ মাস ধরে নগরীর ২৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আলমগীর হোসেন কারাগারে।

ওই ওয়ার্ডের আবদুল ওহাব, সামছুল হক, তুহিন মিয়াসহ আরও কয়েকজন বাসিন্দার সঙ্গে কথা হয় নিউজবাংলার।

তারা বলেন, জনপ্রতিনিধিরা ভোটে জেতার পর ভোটারদের কথা ভুলে যান। ঝগড়াঝাটি করে মানুষ মেরে এখন তারা কারাগারে গিয়ে পড়ে আছেন।

নগরীতে সম্প্রতি আলোচনায় আছেন ১৫ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর সাইফুল বিন জলিল। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই ওয়ার্ডের কয়েকজন ব্যক্তি বলেন, যারা অপরাধ দমন করবে, সমাজে ন্যায় ও শৃঙ্খলা বজায় রাখবে, তাদের কাছেই জনগণ এখন অনিরাপদ।

জনদুর্ভোগের বিষয়ে ‘সচেতন নাগরিক কমিটি’র সভাপতি বদরুল হুদা জেনু বলেন, ‘নাগরিকদের জন্মসনদ, মৃত্যুসনদ, পাসপোর্টের জন্য সত্যায়ন ও ওয়ারিশ সনদসহ বিভিন্ন সেবা প্রতিনিয়ত দরকার হয়। এখন যদি ওয়ার্ডের কাউন্সিলররা এভাবে অনুপস্থিত থাকে তাহলে নগরবাসীর কষ্ট বেড়ে যাবে।’

সিটি মেয়র মনিরুল হক সাক্কু জানান, ‘যেসব ওয়ার্ডের কাউন্সিলররা সেখানে এখন অনুপস্থিত, সেসব ওয়ার্ডে নাগরিক সেবা নিশ্চিতে সচিবদের বাড়তি দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। কাজগুলো সমন্বয়ের চেষ্টা করা হচ্ছে।’

কাউন্সিলরদের অপরাধমূলক কাজে জড়িত হওয়ার অভিযোগ সামনে আসায় বিব্রত বলে জানান তিনি। বলেন, ‘কাউন্সিলরদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল হলে স্থানীয় সরকার বিধান অনুযায়ী তাদের পদ শূন্য হয়ে যাবে। তখনই কেবল আমরা ওই পদের জন্য নতুন জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত করার প্রক্রিয়ায় যেতে পারব।’

ইউটিউবে আমাদের চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন: