ডেস্ক রিপোর্টঃ কুমিল্লা কোতোয়ালি থানার দক্ষিণ পাশেই অবস্থিত ‘ফয়েজ বক্স ভূঞা অ্যান্ড আর্মস স্টোর’। দোকানমালিক আবদুল হামিদ বাবুলের সঙ্গে থানা পুলিশের একাধিক কর্মকর্তার সখ্য ছিল। সেই সুবাদে প্রায় প্রতিদিনই অস্ত্রের দোকানে বসে বাবুলের সঙ্গে আড্ডা দিতেন পুলিশের কর্মকর্তারা। কিন্তু কোতোয়ালি থানা পুলিশের কোনো কর্মকর্তাই ঠাওর করতে পারেননি, বাবুলের এ অস্ত্রের দোকানের আড়ালে দীর্ঘদিন ধরে চলছিল অবৈধ অস্ত্র ও গুলির জমজমাট কারবার।

এক-দুদিন নয়, বছরের পর বছর ধরে এ দোকানের লাইসেন্স ব্যবহার করে অসংখ্য অস্ত্র ও গুলি দেশের বিভিন্ন অপরাধ চক্রের সদস্যের কাছে বিক্রি হয়েছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের (সিটিটিসি) স্পেশাল অ্যাকশন গ্রুপের (এসএজি) আর্মস এনফোর্সমেন্ট টিমের একাধিক কর্মকর্তা। দেশ রূপান্তরকে তারা জানান, গত সোমবার গোপন সংবাদের ভিত্তিতে রাজধানীর গুলিস্তানে ঢাকা ট্রেড সেন্টারের সামনে থেকে অস্ত্র ও গুলি কেনাবেচার সময় হাতেনাতে গ্রেপ্তার করা হয়েছে কুমিল্লার ফয়েজ বক্স অ্যান্ড আর্মস স্টোরের মালিক আবদুল হামিদ বাবুলকে (৫০)। এছাড়া তার সঙ্গী শফিকুল ইসলাম বিটু ও জালালউদ্দিন নামে আরও দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে দুটি ওয়ান শুটার গান, একটি ডাবল ব্যারেল বন্দুক ও ৭০ রাউন্ড গুলি। যার সবই অবৈধ।

আর্মস এনফোর্সমেন্ট টিমের অতিরিক্ত উপকমিশনার আহমেদুল ইসলাম বলেন, অস্ত্র ব্যবসায়ী আবদুল হামিদ বাবুলের লাইসেন্স থাকলেও তার কাছ থেকে বৈধভাবে অস্ত্র-গুলি কেনাবেচার তথ্য পাওয়া যায়নি। দীর্ঘদিন ধরে তিনি এ লাইসেন্স দেখিয়ে অবৈধভাবে অস্ত্র-গুলি বিক্রি করছিলেন অনেকের কাছে। তার প্রধান সহযোগী শফিকুল ইসলাম বিটু ও জালালউদ্দিনকে গ্রেপ্তার করেছি। তারা কার কার কাছে কী পরিমাণ অস্ত্র ও গুলি বিক্রি করেছেন কিংবা কোন কোন ডিলারের মাধ্যমে এসব সংগ্রহ করতেন সব বিষয়ে জানার জন্য তাদের এক দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট অন্য এক কর্মকর্তা জানান, বেশ কিছুদিন আগে একজন চিকিৎসকের কাছ থেকে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের পর এ চক্রের সদস্যদের সম্পর্কে তথ্য আসতে থাকে। তাদের ওপর নজরদারির একপর্যায়ে কুমিল্লার এক অবৈধ অস্ত্র ব্যবসায়ীর তথ্য পাওয়া যায়। সেই তথ্য ধরে তদন্তের পর কুমিল্লার ফয়েজ বক্স ভূঞা অ্যান্ড আর্মস স্টোরের মালিক আবদুল হামিদ বাবুল ও তার চক্রের সদস্যদের বিষয়ে অবৈধ অস্ত্র ও গুলি কারবারের তথ্য পাওয়া যায়। এরই একপর্যায়ে তাদের ধরা হয়। তবে পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে পারভেজ, আওয়াজ, জয়নালসহ আরও চারজন পালিয়ে গেছে। তাদের ধরার জন্য বিভিন্ন জায়গায় অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে বলে জানান ওই কর্মকর্তা।

সিটিটিসির তথ্যমতে, বাবুল গত চার মাসে একাধিক অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রসহ দুই হাজারের বেশি গুলি অবৈধভাবে বিক্রি করেছেন তার চক্রের সদস্যদের মাধ্যমে। এসব অস্ত্র ও গুলি তিনি তার সিন্ডিকেটের বিভিন্ন ডিলারদের কাছ থেকে সংগ্রহ করতেন। তারপর বিভিন্ন অবৈধ ব্যবসায়ীর মাধ্যমে বিভিন্ন অপরাধীর কাছে বিক্রি করতেন। তার কাছ থেকে যারা অস্ত্র ও গুলি নিয়ে যেতেন, তাদের অন্যতম হলেন শফিকুল ইসলাম ওরফে বিটু। তিনি একসময় ছাত্রদলের রাজনীতি করতেন। পরে কুমিল্লার ক্যাডার হিসেবে পরিচিতি আছে। বর্তমানে এলাকায় তিনি একটি স্টেশনারি দোকান দিয়েছেন। সেই দোকানির পরিচয়ে চলাফেরা করলেও মূলত তিনি গোপনে অবৈধ অস্ত্র ও গুলির কারবার চালিয়ে আসছিলেন।

সিটিটিসির প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বিটু জানিয়েছেন, কুমিল্লা, চাঁদপুরের শাহরাস্তি, নারায়ণগঞ্জ, সোনারগাঁ, চট্টগ্রাম, ফরিদপুর ও কুষ্টিয়াসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় তার কাস্টমার রয়েছেন। এছাড়া ওই কাস্টমারদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য শক্তিশালী নেটওয়ার্ক আছে তার। এ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে প্রতি মাসে তিনি শত শত রাউন্ড গুলি বিক্রি করে আসছিলেন। সিটিটিসির এক কর্মকর্তা জানান, অপরাধজগতে সাধারণত পয়েন্ট থ্রি টু, পয়েন্ট সিক্স ফাইভ ও পয়েন্ট টুটু গুলির চাহিদা সবচেয়ে বেশি। এছাড়া একে টুটুর গুলিও সরবরাহ করতেন তিনি। এসব গুলি বাবুল বিভিন্ন ডিলারের কাছ থেকে ২৩০ টাকা হারে সংগ্রহ করতেন। তারপর সেসবের দাম চড়িয়ে ৫০০-৬০০ টাকায় সরবরাহ করেতেন বিটুর কাছে। বিটু প্রতিটির দাম নিতেন ১৫০০ থেকে ২ হাজার টাকা।

থানার পাশে অবৈধ ব্যবসা চললেও জানেন না পুলিশের কর্মকর্তারা : কুমিল্লা কোতোয়ালি থানা পুলিশ ও সিটিটিসির একাধিক কর্মকর্তা জানান, কোতোয়ালি থানার দক্ষিণ পাশেই ফয়েজ বক্স ভূঞা অ্যান্ড আর্মস স্টোর। এই দোকানের মালিক ফয়েজ বক্স মারা যাওয়ার পর তার ছেলে আবদুল হামিদ ওরফে বাবুল চার বছর আগে তার নামে লাইসেন্স নেন। দীর্ঘদিন ধরে অস্ত্র ও গুলি বিক্রির বৈধ লাইসেন্স নিলেও তিনি বৈধভাবে অস্ত্র ও গুলি বিক্রি করেন না বলেই চলে। সন্ধ্যার পর তার দোকানে কোতোয়ালি থানা পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা নিয়মিত আড্ডা দেন। চা পান করেন। কিন্তু তার দোকানের এসব অস্ত্র ও গুলির গ্রাহক কারা, কীভাবে বিক্রি করেন তার কিছুই জানেন না। কোতোয়ালি থানার পরিদর্শক সালাহউদ্দিন বলেন, বাবুলের অস্ত্রের দোকান থানার পাশেই। কিন্তু সেই দোকানের কারবার সম্পর্কে আমরা কিছু জানি না।

দেশের বিভিন্ন অপরাধী বিটুর মাধ্যমে অস্ত্র ও গুলি কেনেন : আবদুল হামিদ বাবুল বিভিন্ন বৈধ ডিলারের কাছ থেকে অবৈধভাবে অস্ত্র ও গুলি সংগ্রহ করতেন। তারপর সেসব অস্ত্র ও গুলি তার চক্রের প্রধান সদস্য শফিকুল ইসলাম বিটুর কাছে সরবরাহ করতেন। বিটু তার সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এসব অস্ত্র বিশেষ করে গুলি চড়া দামে বিক্রি করতেন। বিটুর বাড়ি কুমিল্লা সদরে বজ্রপুরে। তার বাবার নাম মৃত সিরাজুল ইসলাম। বিটু একসময় ক্যাডার ছিলেন। পরবর্তীকালে এলাকায় একটি স্টেশনারি দোকান দেন। সেই দোকানদারির আড়ালেই মূলত অস্ত্র ও গুলির ব্যবসা চালিয়ে আসছিলেন। সিটিটিসির অন্য এক কর্মকর্তা জানান, বিটু সব শ্রেণির অপরাধীর কাছে অস্ত্র ও গুলি বিক্রি করেন। দস্যু থেকে শুরু করে সর্বহারা, ছিনতাইকারী, পেশাদার কিলার ও রাজনৈতিক ক্যাডারদের কাছে অস্ত্র ও গুলি বিক্রি করে থাকেন। গ্রেপ্তার হওয়া জালাল পেশায় ডাকাত। তিনিও তাদের কাছ থেকে অস্ত্র ও গুলি কিনতেন নিয়মিত। এই জালালের বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় একাধিক মামলা রয়েছে।

আর্মস এনফোর্সমেন্ট টিমের অতিরিক্ত উপকমিশনার জাহাঙ্গীর আলম বলেন, বৈধ অস্ত্র ব্যবসার আড়ালে অনেকেই অবৈধ অস্ত্র ও গুলির ব্যবসায় জড়িত। আমাদের হাতে গ্রেপ্তার হওয়া বাবুল ও বিটুর সিন্ডিকেটের আরও অনেক সদস্যের তথ্য পেয়েছি, যারা দেশের বিভিন্ন এলাকার অপরাধীর কাছে অবৈধ অস্ত্র ও গুলি বিক্রির সঙ্গে জড়িত। তাদের সবাইকে আইনের আওতায় নিয়ে আসার চেষ্টা চলছে।

সূত্রঃ দেশ রূপান্তর