ডেস্ক রিপোর্টঃ কিছুতেই যেন ক্ষান্ত হচ্ছেনা কুমিল্লার মাদক ব্যবসায়ীরা। মাদক বিরোধী অভিযানে গত দুবছরে অর্ধশতাধিক মাদক কারবারি নিহত হলেও নির্মূল করা সম্ভব হয়নি মাদক ব্যবসা।

ভারত সীমান্তবর্তী জেলা হওয়ায় দেশে মাদক প্রবেশের একটি প্রধান ট্রানজিট পয়েন্ট এ জেলাটি। সম্প্রতি সীমান্তবর্তী এলাকা ও মাদকের আখড়া হিসেবে চিহ্নিত এলাকা গুলোতে ফের সক্রিয় হচ্ছে মাদক কারবারিরা। প্রতিদিনই সীমান্তের বিভিন্ন অরক্ষিত এলাকা দিয়ে দেদারছে প্রবেশ করছে ভারতীয় ইয়াবা, গাজা, মদ, ফেন্সিডিল, বিয়ার, স্কার্ফ সহ নানা জাতের মাদক। একসময় শুধু মিয়ানমার থেকে ইয়াবা এলেও এখন চোরাই পথে ইয়াবা আসছে ভারত থেকে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সীমান্তের মাদক কারিবারিদের সাথে কথা জানা যায়, ভারতের ভেতরে বাংলাদেশ সীমান্ত সংলগ্ন এলাকা গড়ে উঠেছে একাধিক ইয়াবার কারখানা। মানের দিক থেকে কিছুটা খারাপ হলেও দামে কম ও পাচারে সুবিধা থাকায় ভারতীয় ইয়বাই এখন দেশের এক তৃতীয়াংশ মাদসেবীরা সেবন করছে।

সম্প্রতি জেলার সীমান্ত এলাকা সহ বিভিন্ন থানা এলাকা ও মহাসড়কে বড় বড় বেশকিছু মাদকের চালান আটক হওয়ায় আবার আলোচনায় মাদক এসেছে প্রসঙ্গ।

দেশব্যাপী জোড়ালো মাদক বিরোধী অভিযানের সময় ঢা ঢাকা দিয়ে পালিয়ে থাকা শীর্ষ মাদক কারবারীরা ফিরে আসতে শুরু করেছে এলাকায়। ব্যাপক ধরপাকড়ে আটক মদক ব্যবসায়ীদের অনেকেই জামিনে মুক্ত হয়ে আবারো যুক্ত হচ্ছে মাদক কারবারে।

গত ২০১৮ সালের ৪ঠা মে বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকার মাদকের বিরুদ্ধে সাহসি পদক্ষেপ গ্রহণ করে। কঠোর অবস্থান নিয়ে জিহাদ ঘোষণা করা মাদকের বিরুদ্ধে। মাদকের বিষয়ে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করা হয় পুলিশ র‌্যাব বিজিবি সহ বিভিন্ন বাহিনী ও প্রশাসনের পক্ষ থেকেও। ব্যাপক আলোচনা আর সমালোচনার মাঝেও বর্তমান সরকার ঘোষিত মাদক বিরোধী অভিযানকে সাহসী ও প্রশংসনীয় পদক্ষেপ হিসেবেই দেখেছে দেশবাসী। জনসাধারণের মাঝেও ব্যাপক সারা জাগে গোটা দেশে মাদক বিরোধী এই আন্দলোনে। মাদক প্রতিরোধে চিহ্নিত মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে সরাসরি একশান শুরু করে পুলিশ প্রশাসন। ক্রমাগত ধরপাকড় আর ক্রসফায়ারের কারনে কমে আসে মাদকের দৌরাত্ম। দিশেহারা হয়ে শীর্ষ মাদক কারবারিরা আত্মগোপনে চলে যায় অনেকেই। সারাদেশে চিহ্নিত ও তালিকাভূক্ত মাদক কারবারিদের কয়েক শতাধিক নিহত হয় কথিত ক্রসফায়ারে। বেগতিক দেখে মাদক কারবারিদের অনেকেই পাড়ি জমায় বিদেশে, আবার অনেকেই মুচলেকা দিয়ে আত্মসমর্পণ করে ব্যবসা ছেড়ে দেয়ার প্রতিশ্রুতিতে করাবরনও করে।

সম্প্রতি নানা ঘটনা দুর্ঘটনা এবং আলোচনা সমালোচনা ও সময়ের পরিক্রমায় ক্রমেই কিছুটা শিথিলতা পরিলক্ষিত হয় মাদক বিরোধী জোড়ালো অভিযানের। তবে প্রশাসন জানায় মাদকের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান এটি একটি চলোমান প্রক্রিয়া। অভিযান অব্যাহত আছে এবং প্রতিদিনই জেলার বিভিন্ন এলাকায় মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে। বিপুল পরিমান মাদক সহ আটক ও হচ্ছে অনেকেই। বিগত দিনে অভিযানের সময় সীমান্তবর্তী এ জেলাটিতে পরিস্থিতির যে খুব একটা পরিবর্তন হয়ছে তা নয় । তবে মাদকের আগ্রাসন কমে এসেছিলো আশানুরূপ ভাবেই। বিভিন্ন এলাকায় জনসাধারণ ও সোচ্চার হয়েছিলো মাদকের বিরুদ্ধে। অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে চলে আসে মাদকের আগ্রাসন।

এদিকে মাদকপ্রবণ এলাকাগুলোতে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, অভিযানের কিছুটা শিথিলতার সুযোগে জোড়ালো মাদক বিরোধী অভিযানে পালিয়ে আত্মগোপনে থাকা জেলার তালিকাভূক্ত শীর্ষ মাদক কারবারি ও ভারতে সীমান্তের মাদক ব্যাবসায়ীরা পুনরায় ফিরে এসেছে এলাকায়। এছাড়া গ্রেপ্তার হওয়া অনেকে জেল থেকে জামিনে বেড়িয়ে এসে পুনর্বাসন করতে না পাড়ায় তারাও ফিরে যাচ্ছে পুরোনো মাদক ব্যবসায়। মাদক বিরোধী অভিযান শুরুর পর থেকে গত দু’বছরে কুমিল্লায় বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে প্রায় অর্ধশতাধিক চিহ্নিত মাদক কারবারি।

“বন্দুক যুদ্ধে” নিহতরা সবাই শীর্ষ মাদক বিক্রেতা ছিল বলে দাবী পুলিশের। তবে এ নিয়ে স্থানীয় বিভিন্ন মহলের রয়েছে নানান মতপার্থক্য। অনেকের দাবী মাদকবিরোধী অভিযানে বন্দুকযুদ্ধে যারা মারা গেছে, তারা শীর্ষ কারবারি নয় বরং বেশীর ভাগই খুচরা বিক্রেতা। কারন হিসেবে তাদের দাবী নিহত হলেও জেলায় মাদকের আমদানি ও কেনাবেচা কমেনি, বরং মাদকের কারবার বেড়েই চলছে দিন দিন। কুমিল্লা জেলার ১৭টি উপজেলার মধ্যে সীমান্তবর্তী উপজেলা রয়েছে পাঁচটি। সীমান্ত দিয়ে মাদক আমদানি ও কেনাবেচার জন্য বেশি আলোচিত ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা। এলাকায় খোজ নিয়ে জানা যায়, উপজেলা সীমান্তের প্রায় ৭/৮টি চিহ্নিত পয়েন্ট দিয়ে লাইনম্যান ও সীমান্তের ও পাড়ের মাদক ব্যবসায়িদের সহায়তায় দেশে ঢুকছে মাদক। গত বছরের ১০ই অক্টোবর মাদক কারবারিদের ধরতে গিয়ে এই উপজেলার আশাবাড়ি সীমান্ত এলাকার শীর্ষ মাদক কারবারি মন্টু ও তার সহোযোগি মাদক কারবারিরা র‌্যাবের ৩সদস্যকে ভারত সীমান্তের ভেতরে নিয়ে ব্যাপক মারধর করে। অস্ত্র সহ আটকে রেখে বিএসএফ’র হাতে তুলে দেয়। এরপর পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে তাদের ফেরত আনা হয় ১০ ঘন্টা পর । মাদক নিয়ন্ত্রণে জেলা পুলিশ, ডিবি ও র‌্যাবের নিয়মিত অব্যাহত থাকেলেও সীমান্তের এপাড়ে এসে নানা কৌশলে ছড়িয়ে পরছে সারা দেশে।

বিশেষ করে জেলার জিরো পয়েন্টেগুলোতে এখনো মাদকের খোলামেলা হাটে চলছে মাদকের রমরমা বেঁচাকেনা। এছাড়াও বুড়িচং, সদর, সদর দক্ষিণ এবং চৌদ্দগ্রাম উপজেলার বিভিন্ন পয়েন্টে মাদক কারবার ও আমদানির জন্য বেশ আলোচিত। প্রতিটি উপজেলা সীমান্তের চিহ্নিত কিছু পয়েন্ট দিয়ে প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকার মাদকসেবীরা ভীর জমাচ্ছে মাদক সেবন করতে। মটরসাইকেল, প্রাইভেটকার, সিএনজি যোগে শতশত তরুণ ও যুবকরা বিজিবি কে ম্যানেজ করে জিরো পয়েন্ট ও সীমান্ত পেড়িয়ে গিয়ে ওপাড়ে করছে মাদকসেবন। মাঝে মাঝেই এসব উপজেলার সীমান্তগুলো থেকে বিজিবি লাখ লাখ টাকার মাদকদ্রব্য আটক করছে প্রতিদিনই। বিজিবি, র‌্যাব ও পুলিশের হাতে আটক হচ্ছে কারবারিরা। তবুও মাদকের সরবরাহ কমছে না বলেই অভিযোগ সচেতন এলাকাবাসীর।

কুমিল্লা জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স অবস্থানেই রয়েছে জেলা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। মাদকের সাথে জড়িতদের কোন ভাবেই ছাড় দেয়া হচ্ছে না। প্রতিদিনই অব্যহত আছে অভিযান। জেলায় আগের চেয়েও অনেক কমে এসেছে মাদকের প্রভাব ও বিস্তার।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) এর কুমিল্লা জেলার সাধারণ সম্পাদক আলী আকবর মাসুম বলেন,‘মাদক কেনাবেচা এবং মাদক কারবারের সঙ্গে যারাই জড়িত, তাদের বিচারের আওতায় এনে শাস্তি প্রদান করতে হবে। বিচারবহির্ভূত হত্যার আইনের কোনও ভিত্তি নেই। এটি কোনও স্থায়ী সমাধান নয়।’

বুড়িচং উপজেলা চেয়ারম্যান আখলাক হায়দার বলেন, “মাদক একটি সামাজিক ব্যাধি এটি ক্যান্সারের চেয়েও জঘন্য একটি সংক্রামক ব্যাধি। মাদক থেকে ভবিষ্যত প্রজন্মকে রক্ষা করতে সামাজিক ভাবে প্রতিরোধের বিকল্প নাই। মাদক ব্যাবসায়ীদের পূনর্বাসন করা হলে এর প্রভাব কমে আসবে। ”

নারী নেত্রী ও সাংবাদিক ইয়াসমিন রীমা বলেন,‘আমি ব্যক্তিগতভাবে বিচারহীন হত্যাকে সমর্থন না করলেও সহমত পোষণ করি। আগে দেশের ভবিষ্যৎ বাঁচুক, পরে আইনকানুন।’

গণজাগরণ মঞ্চ কুমিল্লার মুখপাত্র খায়রুল আনাম রায়হান বলেন, মাদক সমস্যার সমাধান করতে হলে মানুষকে সচেতন করতে হবে এবং মাদকের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। মাদকসহ অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্তদের কর্মশালার মাধ্যমে পরিবর্তন করতে হবে।’