মো. ওমর ফারুকঃ কুমিল্লার নাঙ্গলকোট উপজেলার জোড্ডা পশ্চিম ইউপির ঘোড়াময়দান দক্ষিণ মধ্যম পাড়া গ্রামের এক পরিবারের ৬ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। অপরদিকে ওই ইউপির করপাটি গ্রামের এক সিএনজি চালক ও হোটেল শ্রমীকের মৃত্যু হয়েছে। গত রোববার রাতে তাদের নিজ নিজ বাড়ীতে জানাযা শেষে দাফন করা হয়েছে। তিন পরিবারের ৮ জনের মৃত্যুতে স্বপ্ন পূরন হয়নি তাদের। নিহত জসিমের ছোট ছেলে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে। ডাক্তার তাকে নিবির পর্যবেক্ষণে রেখেছে। এক পরিবারের ৬ জনের মর্মান্তিক মৃত্যুতে পুরো গ্রামে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, ঘোড়াময়দান গ্রামের মৃত আব্দুর জব্বারের ৬ ছেলে এক মেয়ে রেখে মারা যাওয়ায়। ছেলেদের মধ্যে জসিম ২য়। তাদের বাবার দেয়া সব মিলিয়ে জায়গাজমি ছিল ২৪ শতক। জসিম ১৫ বছর ধরে কুমিল্লা নগরীর গোয়ালপট্টি এলাকার বন্দন হোটেলে ভাড়া নিয়ে ব্যাবসা করে আসছিল। ওই দোকানে জসিমের দুই ছেলে কাজ করত বড় ছেলে শিপন (২২) ছোট ছেলে রিদয় (১৮) তার স্ত্রী শিরিনা বেগম রান্নার কাজে নিয়োজিত ছিল। ছোট মেয়ে নিপু পড়া লেখা করত কুমিল্লা হাই স্কুলে ৭ম শ্রেনীতে। গত শনিবার জসিম নিজ বাড়ী থেকে মা, ছকিনা বেগমকে নিয়ে করপাতি গ্রামে (নানার বাড়ী) ও সফিক শশুর বাড়ীতে বেড়াতে যায়।

রোববার সকাল ১০ টায় করপাটি গ্রামের সিএনজি চালক জামাল হোসেন ও হোটেলের শ্রমীক সায়মনকে নিয়ে কুমিল্লার পথে রওনা হয়। এরপর বাগমারা জামতলী বাজার এলাকায় গেলে সড়ক দূর্ঘটনায় ঘটনাস্থলে পাঁচ জন ও পরে আরও তিন জনের মৃত্যু হয়। নিহতদের মধ্যে জসিমের মা, ছকিনা খাতুন (৭০) শ্রমীক সায়মন ও সিএনজি চালক জামাল ও জসিম রয়েছে। নিহত জসিমের ভাই মহসিন ও বড় বোন আফরোজা বেগম জানান, জসিম ১৫ বছর ধরে কুমিল্লা একটি হোটেল ও বাসা ভাড়া নিয়ে বসবাস করে আসছে। বাবার দেয়া একটি জায়গাতে ট্রিনের ঘর দিয়ে কোনো রকম বসবাস করছে। তার স্বপ্ন ছিল মেয়ে নিপুকে পড়া লেখা করিয়ে ডাক্তার বানাবে। আর ছোট ছেলে রিফাতকে মাওলানা বানাবে। কিন্তু ঘাতক বাস কেড়ে নিলো সকলের স্বপ্ন। জসিমের ছোট ছেলে আহত রিফাত মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে। সেই এখন ঢাকা পান্থপথ ইউনিহেলথ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে। বর্তমানে ডাক্তার তাকে নিবির পর্যবেক্ষণে রেখেছে। জসিমের এক মাত্র সন্তান রিফাত যদি বেচে থাকে তাহলে এই সংসারের প্রদীপ ছড়াবে। সেই কুমিল্লা দারুছুন্নাত ক্যাডেট মাদ্রাসার (৩য়) শ্রেনীর শিক্ষার্থী। সংসারের অভাব দুর করতে জসিম ২০০৭ সালে দুবাই পাড়ী জমায়।কিন্তু ভাগ্যের কাছে হেরে যায়। এক বছর পর আবার দেশে ফিরে এসে হোটেল ব্যবসায় মনযোগী হয়। স্বপ্ন ছিল একটি নতুন বাড়ী করার। তার জন্য ২০১৮ সালে প্রতিবেশি চাচা আমির হোসেনের কাছ থেকে ৯ শতক জায়গা ক্রয় করে। শেষ পর্যন্ত ওই জায়গায় জসিমসহ নিহত ৬ জনকে দাফন করা হয়েছে। এখন শুধু জিবিত আছে রিফাত ( ১০)। সেইও ঝুঁকিতে রয়েছে।

সিএনজি চালক করপাটি গ্রামের জামাল হোসেনের পরিবারের মাঝে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। জামাল হোসেনের দুই ছেলে দুই মেয়ে। বড় মেয়ে ফাহিমা ( ১৬) ছড়িয়া বাজার আলিম মাদ্রাসার ৭ম শ্রেনীর শিক্ষার্থী। ছেলে রাকিব (১৪) শাকতলী উচ্চ বিদ্যালয়ের ৬ষ্ঠ শ্রেনীর শিক্ষার্থী। আর রাহান (৫) মিমতাহা ( ৩) মায়ের কাছে থাকে। জামালের কোন জায়গা জমি নেই। মৃত্যুর আগে বিভিন্ন ব্যাংক ও এনজিওর নিকট থেকে ৩/৪ লাখ টাকা ঋন নেয়। তার স্ত্রী আলেয়া বেগম সমাজপতি ও প্রভাবশালীদের কাছে আর্থিক সহযোগীতা চেয়েছেন। তার সংসারে আয় -উপার্জন করার কেউ নেই। অপর দিকে হোটেলের শ্রমীক করপাতি আর্মি বাড়ীর নানা মৃত আব্দুল গফুরের বাড়ীতে থাকত। নিহত সায়মন গত ২ বছর ধরে জসিমের দোকানে চাকুরী করত। প্রথমে মাসে ৫ শ, টাকা করে গত দুই বছর চাকুরী করার পর গত ২ মাস আগে সায়মনের বেতন নির্ধারন করা হয় প্রতি মাসে ২ হাজার টাকা। তার মা জাহানারা বেগম জানান, সায়মনের বয়স যখন ২২ দিন তখন, তার বড় ভাই রাসেল ও ফয়সালকে নিয়ে বাপের বাড়ীতে চলে আসি।সায়মনের বাবা পাটোয়ার গ্রামের মো.হোসেন। এরপর হোসেন তার স্ত্রী জাহানারা বেগমকে তালাক দেয়। বিভিন্ন জায়গায় ঝিয়ের কাজ করে কোনো রকম জীবিকা নির্বাহ করছি। বর্তমানে সায়মনের ভাই রাসেল ও ফয়সাল বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে শ্রমীকের কাজ করছে। থাকার জন্য আছে একটি মাত্র ট্রিনের ঘর। আবার ওই ঘরে কনো রকম বসবাস করে আসছি। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নাঙ্গলকোট উপজেলা নির্বাহী অফিসার দাউদ হোসেন চৌধুরী প্রত্যেক পরিবারকে কাফন ও দাফনের জন্য ১০ হাজার টাকা করে দিয়েছে।