মো: ওমর ফারুকঃ কুমিল্লার নাঙ্গলকোট থেকে মুঠোফোনে শ্বশুরবাড়ি চৌদ্দগ্রামে ডেকে নিয়ে শ্বশুরবাড়ির লোকজন কর্তৃক জামাতা শাহীনকে নৃশংসভাবে হত্যার আজ ২১ ফেব্রুয়ারি এক বছর পূর্ণ হয়েছে।

গত বছরের ২১ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় শ্বশুরবাড়ির লোকজন শাহীনকে গলা কেটে, দু‘পায়ে, হাতে এবং শরীরের বিভিন্নস্থানে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে নৃশংসভাবে হত্যার পর লাশ ঢাকা-চট্রগ্রাম মহাসড়কের সুজাতপুরে ফেলে দিয়ে শাহীন সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে বলে অপপ্রচার চালায়। শাহীন হতাকান্ডটিকে চৌদ্দগ্রাম থানা পুলিশ শুরু থেকেই সড়ক দুর্ঘটনা বলে চালিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেন। এনিয়ে শাহীনের মায়ের আদালতে হত্যা মামলা দায়েরের বিপরীতে পুলিশ আদালতে শাহীনের সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে বলে প্রতিবেদনও দাখিল করেন। এতে হত্যা মামলাটি খারিজ হয়ে যায়। পরে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগ ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে শাহীনের মৃত্যুকে নর হত্যা বলে উল্লেখ করেন। ফলে শাহীন সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে বলে প্রচারে পুলিশের চেষ্টা ব্যার্থ হয়।

ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পেয়ে শাহীনের মা মনকির বেগম শাহীনকে হত্যার ঘটনায় আদালতে পুনরায় মামলা করেন। যার নং-সি আর-২৭০/১৮, তারিখ-২৪/৫/২০১৮। আদালত মামলাটি শুনানি করে চৌদ্দগ্রাম থানা পুলিশকে মামলাটি এফ. আই. আর হিসেবে নিতে বলেন। চৌদ্দগ্রাম থানা পুলিশ গত বছরের ১ জুলাই মামলাটি এফ. আই. আর হিসেবে নেয়ার গত সাড়ে সাত মাসেও মামলার কোন অগ্রগতি না হওয়ায় মামলার বাদি শাহীনের মা মনকির বেগম সাংবাদিকদের কাছে হতাশা প্রকাশ করেন।

কুমিল্লা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (দঃ) আবদুল্লাহ আল মামুন মামলার বিষয়ে বলেন, পুলিশ মামলাটি তদন্ত করছে। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা চৌদ্দগ্রাম থানার উপ-পরিদর্শক ( এস আই) মিলন মনির বলেন, মামলাটি তদন্তনাধীন রয়েছে। এ পর্যন্ত মামলার কোন আসামী গ্রেফতার হয়নি। আমরা চেষ্টা করছি মামলার মূল রহস্য উদঘাটনের। আশা করছি এ বিষয়ে শ্রীঘ্রই জানতে পারবেন। তিনি শাহীনের স্ত্রীর দায়ের করা সড়ক দুর্ঘটনার মামলার বিষয়ে বলেন, আমি জানতে পেরেছি মামলাটির ফাইনাল প্রতিবেদন দেয়া হয়েছে।

শাহীনকে হত্যার এক বছর পূর্তিতে স্থানীয় সাংবাদিকেরা বুধবার শাহীনের নানার বাড়ি নাঙ্গলকোটের বাঙ্গড্ডা ইউনিয়নের গান্দাছি গ্রামে গিয়ে তার মা মনকির বেগমের সাথে কথা বলেন। সাংবাদিকদের কাছে পেয়ে শাহীন হত্যার বিচার চেয়ে মনকির বেগমের আহাজারিতে এলাকার পরিবেশ ভারী হয়ে উঠে। তিনি মাটিতে শুয়ে বিলাপ করতে-করতে বলেন, শাহীনকে শ্বশুরবাড়ির লোকজন নৃশংসভাবে হত্যার এক বছরেও মামলায় কোন অগ্রগতি নেই। আসামীরা প্রকাশ্যে ঘুরলেও চৌদ্দগ্রাম থানা পুলিশ এ পর্যন্ত মামলার আসামীদের গ্রেফতারসহ মামলার চার্জসীটও প্রদান করেনি। শাহীনের মা সাংবাদিকদের কাছে অভিযোগ করে বলেন, চৌদ্দগ্রাম থানা পুলিশ শাহীনের শ্বশুরবাড়ি থেকে মোটা অংকের টাকা নিয়ে শাহীন হত্যার ঘটনাটিকে সড়ক দুর্ঘটনা বলে চালিয়ে দেন। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে আরো বলেন, পুলিশ যদি রক্ষক হয়ে, ভক্ষকের ভূমিকা পালন করে তাহলে আমরা কোথায় যাব ? একমাত্র আদালতের ন্যায় বিচারই আমার ছেলের হত্যাকারীদের খুঁজে বের করে উপযুক্ত শাস্তি দিতে পারে বলে তিনি জানান। তিনি শাহীন হত্যাকান্ডের ঘাতকদের চিহিৃত করতে নিরপেক্ষ তদন্তের জন্য মামলাটি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনে (পিবিআই) স্থানান্তরের জন্য সাংবাদিকদের মাধ্যমে আদালতের নিকট আহবান জানান। ছেলে হত্যার সঠিক বিচার দাবি করেন।

জানা যায়, গত বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি শাহীনকে হত্যার ঘটনায় তার মা মনকির বেগম শাহীনের শ্বশুর, শ্বাশুড়ী, স্ত্রী, স্ত্রীর দুইভাইকে আসামীসহ অজ্ঞাতনামা ৬/৭জনের বিরুদ্ধে আদালতে হত্যা মামলা দায়ের করলেও শাহীনকে হত্যার একদিন পর ২২ ফেব্রুয়ারি শাহীনের স্ত্রী শাহেনা আক্তার শাহীন সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায় বলে চৌদ্দগ্রাম থানায় মামলা দায়ের করেন। পরে চৌদ্দগ্রাম থানা পুলিশের তদন্তকারী কর্মকর্তা উপ-পরিদর্শক (এস আই) সাইফুল ইসলম ৪ মার্চ শাহীনের মৃত্যুর ঘটনাটিকে প্রাথমিকভাবে সড়ক দুর্ঘটনাজনিত বলে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করলে আদালত শাহীনের মায়ের প্রথম দায়ের করা হত্যা মামলাটি খারিজ করে দেন।

মামলা সূত্রে জানা যায়, ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি নাঙ্গলকোটের বাঙ্গড্ডা ইউনিয়নের আঙ্গলখোঁড় গ্রামের মৃত মফিজুর রহমানের ছেলে শাহীনের সাথে পাশ^বর্তী চৌদ্দগ্রাম উপজেলার চিওড়া ইউনিয়নের সুজাতপুরের নুরুল আমিনের মেয়ে শাহেনা আক্তারের বিয়ে হয়। বিয়ের সময় শাহীনের মা মনকির বেগম এবং শাহীন স্ত্রী শাহেনা আক্তারকে স্বর্ণালংকার প্রদান করেন। শাহেনা আক্তার স্বামীর দেয়া কানের ও নাকের স্বর্ণালংকার শ্বশুরবাড়ির লোকজনের সহায়তায় বিক্রি করে দেন। এনিয়ে স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে মনোমালিন্য হয়। ঘটনাটি শাহেনা আক্তার তার বাপের বাড়িতে জানায়। খবর পেয়ে গত বছরের ১৬ ফেব্রুয়ারি শাহেনার পিতা নুরুল আমিন আঙ্গলখোঁড় গ্রামে এসে শাহেনা আক্তারকে চৌদ্দগ্রামের সুজাতপুরে নিয়ে যান এবং শাহীনকে গালিগালাজ ও হুমকি দিয়ে যান।

২১ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় শাহীনের শ^শুর ও তার স্ত্রী শাহীনকে মুঠো ফোনে ফোন করে শাহেনা আক্তারকে নিয়ে যেতে চৌদ্দগ্রামের সুজাতপুরে আসতে বলেন। শাহীন ফোন পেয়ে সাথে-সাথে শ্বশুরবাড়ি চৌদ্দগ্রামের সুজাতপুরে যান। ওইদিন রাত আনুমানিক ১০টায় শাহীনের চাচী শ^াশুড়ি শাহীনের মামাতো ভাই মাসুদ আলমকে মুঠো ফোনে জানায়, শাহীন সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে তার লাশ নিয়ে যান। খবর পেয়ে ওই দিন রাত ১১টায় শাহীনের মা মনকির বেগম, মামাতো ভাই মাসুদ আলমসহ পরিবারের লোকজন ঘটনাস্থলে গিয়ে শাহীনের লাশ সনাক্ত করেন। এসময় তারা শাহীনের গলা কাটা, দু‘পাড়ে, মাথায় গুরুতর জখম, শরীরের বিভিন্নস্থানে অঘাতের চিহৃ এবং মুখ এসিডে ঝলসে দিতে দেখেন। চৌদ্দগ্রাম থানা পুলিশ খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে শাহীন সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায় বলে তাদের জানান। কিন্তু শাহীনের পরিবার তার শরীরে আঘাতের চিহৃ দেখে এটিকে সড়ক দুর্ঘটনা মানতে রাজি হননি। পরের দিন ২২ ফেব্রুয়ারি শাহীনের স্ত্রী শাহেনা আক্তার সড়ক দুর্ঘটনায় শাহীন মারা য়ায় বলে চৌদ্দগ্রাম থানায় মামলা দায়ের করেন। পুলিশ শাহীনের লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠায়।

চৌদ্দগ্রাম থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আবদুল্লা আল মাহফুজ বলেন, মামলাটি তদন্তনাধীন রয়েছে। মামলার তদন্ত প্রতিবেদন এখনো আদালতে দাখিল করা হয়নি।

ইউটিউবে আমাদের চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন: