ফারুক আজমঃ নববর্ষকে সামনে রেখে কুমিল্লার হোমনা সদর থেকে ৪ কিলোমিটার দূরে তিতাস নদীর পাশে অবস্থিত শ্রীমুদ্দি গ্রামে বাঁশি পল্লীতে বৈশাখ আসার আগেই প্রতিদিন সকাল থেকে রাত অবধি কর্মব্যস্ত সময় পার করছেন বাঁশি তৈরির করিগররা।
ঐতিহ্যবাহী বাঁশের বাঁশির ব্যবহার দিনে দিনে কমে এলে ও অত্র গ্রামের ৬৪ টি পরিবার এখনও বাঁশি শিল্প ধরে রেখেছে। নতুন বছরের মেলায় বাঁশির যোগান দিতে দিনরাত ব্যস্ত সময় পার করছে এসব পরিবারের সদস্যরা।

কয়েকদিন পরেই নববর্ষ, পহেলা বৈশাখ। আর নববর্ষ মানেই বৈশাখী মেলা। আর মেলায় বাঁশির কদর একটু বেশিই। তাই কুমিল্লার হোমনার শ্রীমদ্দি গ্রামের বাঁশি পল্লীতে তৈরি হচ্ছে নানা রকমের বাঁশি। মেলায় বাঁশির যোগান দিতে ব্যস্ত পল্লীর সবাই।

তাদের পরিবারের নতুন প্রজন্মের অনেকে বাঁশি তৈরির পেশা থেকে সরে যাচ্ছে। আবার বাঁশি তৈরির কাঁচামালের দাম বাড়তে থাকায় অনেকেই ছেড়ে দিয়েছেন এই পেশা।বাঁশি তৈয়ারী মুলিবাঁশ চিটাগাং থেকে সংগ্রহ করতে হয়, কালের বিবর্তনে বাঁশির চাহিদাও কমছে বলে মনে করেন করিগররা।

এসময় বাঁশির কারিগর আঃ খালেক (৭০) বলেন বর্তমানে কয়লার দাম বেশী হওয়ার কারণে এই শিল্প থেকে দিনের পর দিন অনেকে সরে দাড়াচ্ছে। এবিষয়ে দেশীয় ঐতিহ্য এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে সহজ শর্তে ঋনের ব্যবস্থা করা হলে আর গ্রামে বাঁশি যাতে সহজে কারিগররা তৈরি করতে পারে সেই জন্য গ্যাসের ব্যবস্থা করা হলে আমরা এই শিল্পকে ধরে রাখতে পারবো। আমি ৫০ বছর ধরে এই বাঁশির কাজ করি।

রব মিয়া বলেন আমি ২১ বছর ধরে এ পেশায় কাজ করি,বংশীবাদক আবুল কাশেম দুঃখ নিয়ে জানান, একশ’ থেকে সোয়াশ’ বছর ধরে চলছে বাঁশি তৈরির কাজ। পূর্বসূরিদের দেখানো পথে এখনও অন্তত ৬৪টি পরিবার বাংলার ঐতিহ্য লালন করতে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছে বাঁশি তৈরির কাজ। হাশেম মিয়া বলেন ৩০ বছর ধরে বাঁশি তৈরি পেশায় কাজ করি। প্রতিটি বাঁশি খুচরা মূল্য ৫টাকা থেকে শুরু করে ২৫০০’ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করেন এছাড়া আমাদের বাঁশি ইউরোপ, আমেরিকাসহ বিশ্বের ২০-২৫টি দেশে এই শিল্পের খ্যাতি রয়েছে।

হোমনার শ্রীমদ্দি গ্রামের বাঁশি পাড়ার ৬০ বছরের বৃদ্ধ নারী-পুরুষ থেকে স্কুলগামী শিশুরাও বাঁশি তৈরির কাজ করে থাকে। বাঁশিতে নকশা তৈরি, ছিদ্র করা, ধোয়া-শুকানো এবং রঙ করার কাজ নারীরা ও বেশ আগ্রহ নিয়ে কাজ করে থাকেন।

বাঁশির কারিগর তিব্বত চন্দ্র সরকার (৫৩) বলেন, শ্রীমদ্দিতে ব্রিটিশ আমল থেকে বাঁশি তৈরি হয়ে আসছে। ১০-১২ বছর বয়স থেকেই এ কাজ করছি।

বংশীবাদক আবুল কাশেম বলেন, আমার তৈরি বাঁশি ফ্রান্স, জার্মানি, কানাডা, স্পেন, ইতালিসহ বেশ কয়েকটি দেশে রফতানি হয়ে থাকে।আমি ১৭ ধরনের বাঁশি তৈরি করে থাকি। এগুলোর মধ্যে তোতা (মুখ) বাঁশি, মোহন বাঁশি, ফেন্সি বাঁশি, খানদানি বাঁশি, আর বাঁশি (ক্ল্যাসিক্যাল সুরের বাঁশি), বীণ বাঁশি, বেলুন বাঁশি রয়েছে। বিদেশে মুখ বাঁশির কদর অনেক বেশি। কারণ এ বাঁশি একেবারেই প্রাকৃতিক। কোনো রঙ থাকে না তাতে। দেশে বংশীবাদকের কাছে খানদানি বাঁশির কদর অনেক বেশি।