উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ বৃদ্ধির লক্ষ্যে দেশের আটটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নে বিভিন্ন সময়ে ৮ হাজার ৪২২ কোটি টাকা অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। কিন্তু করোনা মহামারী, প্রকল্পের অর্থ ছাড়ে বিলম্ব, জমি গ্রহণে জটিলতা, অভ্যন্তরীণ সমন্বয়হীনতাসহ নানা জটিলতায় দীর্ঘদিন ধরে স্থবিরতা বিরাজ করছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উন্নয়ন প্রকল্পে।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনায় বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৬৫৯ কোটি ৮০ লাখ, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪৮০ কোটি ৬০ লাখ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৫০ কোটি ৫৬ লাখ, খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৮৩৮ কোটি ৩৭ লাখ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ১ হাজার ৪৪৫ কোটি, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ১ হাজার ৯২০ কোটি, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১ হাজার ৬৫৫ কোটি ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেরিটাইম ইউনিভার্সিটিতে ১ হাজার ১৮৩ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। কিন্তু করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে গত ২৬ মার্চ থেকে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সাধারণ ছুটি চলছে। দীর্ঘ ছুটিতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর চলমান উন্নয়নকাজ এক প্রকার বন্ধই রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পের কাজ শেষ করা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। ফলে প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় বাড়তে পারে।

কলেজ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত হওয়ার পর সবচেয়ে বড় বরাদ্দ পেয়েছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। ঢাকা জেলার কেরানীগঞ্জ থানার তেঘরিয়া ইউনিয়নের পশ্চিমদি মৌজায় প্রায় ২০০ একর ভূমির ওপর নতুনভাবে ক্যাম্পাস নির্মাণ করা হবে। কেরানীগঞ্জে নতুন ক্যাম্পাস স্থাপনে ১ হাজার ৯২০ কোটি ৯৪ লাখ ৩৯ হাজার টাকার প্রকল্প চলমান রয়েছে। মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী, নতুন ক্যাম্পাসে একাধিক একাডেমিক ভবন, প্রশাসনিক ভবন, ছাত্রছাত্রীদের জন্য হল, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের আবাসন ব্যবস্থা, চিকিৎসা কেন্দ্র, ক্যাফেটেরিয়া, খেলার মাঠ, সুইমিং পুল, মসজিদ এবং পরিবহন ও আধুনিক বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য প্রয়োজনীয় অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে। গত বছর বরাদ্দের সব টাকা খরচ করা হলেও চলতি বছর করোনার কারণে পুরো বরাদ্দ খরচ করা সম্ভব হয়নি। এখন এ প্রকল্পের কাজের অগ্রগতি মাত্র ৪৬ শতাংশ।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান এ বিষয়ে বণিক বার্তাকে বলেন, এ প্রকল্পে ঢাকা জেলার কেরানীগঞ্জ থানার তেঘরিয়া ইউনিয়নের পশ্চিমদি মৌজায় প্রায় ২০০ একর ভূমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে, যেটা আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। গত দুই বছরে প্রকল্প বাস্তবায়ন প্রায় ৪৬ শতাংশ। করোনার কারণে উন্নয়ন কিছুটা ব্যাহত হয়েছে। আশা করছি সরকারের বেঁধে দেয়া সময়ের মধ্যে এ প্রকল্পের কাজ শেষ হবে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৩টি স্থাপনা নির্মাণসহ সার্বিক উন্নয়নে ১ হাজার ৪৪৫ কোটি টাকার প্রকল্প নেয়া হয় ২০১৮ সালে। অবকাঠামো উন্নয়ন, আবাসিক এবং অন্যান্য সুবিধা সম্প্রসারণের মাধ্যমে মানসম্পন্ন শিক্ষার জন্য উপযুক্ত শিক্ষাদান ও শিক্ষার পরিবেশ সৃষ্টির লক্ষ্যে নেয়া প্রকল্পটি ২০২২ সালে সম্পন্ন হওয়ার কথা ছিল। তবে অভ্যন্তরীণ সমন্বয়হীনতা ও করোনার কারণে কাজের অগ্রগতি এখনো ১০ শতাংশের নিচে।

করোনার মহামারীর মধ্যেই প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে বলে জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়টির পরিকল্পনা ও উন্নয়ন শাখার পরিচালক নাসির উদ্দিন। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, করোনার মধ্যেই স্বাস্থ্যবিধি মেনে উন্নয়নকাজ অব্যাহত রয়েছে। তবে গত বছরের বরাদ্দের তুলনায় ২০ শতাংশ কাজ কম হয়েছে এ বছর। গত অর্থবছরে সরকার যা বরাদ্দ দিয়েছিল তার সব কাজই শেষ হয়েছিল।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০১৮ সালের ১০ জুলাই ৬৫৯ কোটি ৮০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। ২০২২ সাল নাগাদ এ প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। এ প্রকল্প দিয়ে দুটি প্রশাসনিক ভবন (একটি ১০ তলা, অন্যটি তিনতলা) নির্মাণ, ১০ তলাবিশিষ্ট ছয়টি একাডেমিক ভবন, আটটি দোতলাবিশিষ্ট মাঠ গবেষণা, ১০ তলাবিশিষ্ট তিনটি হোস্টেল (একটি ছাত্রী, দুটি ছাত্র), শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য ছয়টি আবাসিক ভবন (পাঁচটি ১০ তলা, একটি ছয়তলা), ছয়তলাবিশিষ্ট টিএসসি কমপ্লেক্স ভবন, আটতলাবিশিষ্ট মাল্টিপারপাস ভবন এবং নারীদের জন্য একটি সুইমং পুল নির্মাণ করা হবে। নানা কারণে প্রকল্পের অগ্রগতি মাত্র ২৯ দশমিক ২৩ শতাংশ।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. লুত্ফুল হাসান বণিক বার্তাকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নে এ ধরনের বড় বরাদ্দ সৌভাগ্যের বিষয়। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো অর্থ ছাড়ে দেরি ও পরিবর্তিত পরিস্থিতির কারণে আমরা কাজের অগ্রগতি আশানুরূপ করতে পারিনি। প্রথম অর্থবছর অর্থ ছাড়ে দেরি করার কারণে খরচ করতে পারিনি। ফলে কাজের অগ্রগতি হয়নি। সেজন্য সেই অর্থ ফেরতও দিয়েছিলাম। পরের অর্থবছরে করোনার কারণে নির্দিষ্ট কাজগুলো সম্পন্ন করতে পারিনি। মহামারী পরিস্থিতি সব উন্নয়ন প্রকল্পেই বাধা তৈরি করেছে। তবে ঘুরে দাঁড়াতে আমরা বিকল্প পরিকল্পনা হাতে নিয়েছি। প্রতিটি কাজকে আলাদা ভাগে বিভক্ত করে একজন অধ্যাপকের নেতৃত্বে শক্তিশালী তদারকি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ কমিটি কাজগুলো সময়মতো শেষ করার পাশাপাশি মান তদারক করছে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৫০ কোটি ৫৬ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয় ২০১৮ সালে। দক্ষিণবঙ্গের সর্ববৃহৎ ২ হাজার ৫০০ আসনবিশিষ্ট অডিটোরিয়াম নির্মাণ, নবনির্মিত একাডেমিক ভবনটি ১০ তলায় বর্ধিতকরণ, প্রশাসনিক ভবন পাঁচতলা থেকে ১০ তলায় উন্নীতকরণ, শিক্ষক-কর্মকর্তাদের ডরমিটরি ও হলগুলো পাঁচতলা থেকে ছয়তলায় বর্ধিতকরণ, অ্যাম্ফিথিয়েটার নির্মাণের কার্যক্রম হাতে নেয়া হয়। তবে কাজের অগ্রগতি ৪৯ শতাংশ। প্রকল্পের কাজের অগ্রগতির বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন শাখার ডেপুটি ডিরেক্টর তুহিন মাহমুদ বণিক বার্তাকে বলেন, উন্নয়নের জন্য ২৫০ কোটি টাকার বিপরীতে ১১৩ কোটি বরাদ্দ হয়েছে। শ্রমিক সংকটের কারণে তিন মাস উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ বন্ধ ছিল। তবে এরই মধ্যে কাজ শুরু হয়েছে। প্রশাসনিক ভবন পাঁচতলা থেকে ১০ তলায় উন্নীতকরণ প্রকল্পে আরো দোতলা ছাদ হয়ে গেছে।

২০১৮ সালে ৮৩৮ কোটি ৩৭ লাখ টাকার প্রকল্প নেয়া হয় খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে। প্রকল্পটি ২০২২ সালে সমাপ্ত হওয়ার কথা রয়েছে। প্রকল্পের অধীনে ভূমি অধিগ্রহণ, ১০ তলাবিশিষ্ট নতুন একাডেমিক ভবন ও ইনস্টিটিউট ভবন নির্মাণ, পাঁচতলাবিশিষ্ট দুটি ছাত্র হল ও দুটি ছাত্রী হল, পাঁচতলা পর্যন্ত দুটি ছাত্র হলের আনুভূমিক সম্প্রসারণ, ১০ তলাবিশিষ্ট শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের আবাসিক ভবন, পাঁচতলাবিশিষ্ট শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের ডরমিটরি ভবন, ১০ তলাবিশিষ্ট স্টাফদের আবাসিক ভবন, সোলার সিস্টেম স্থাপনসহ সাবস্টেশন নির্মাণ করা হবে। এখন পর্যন্ত প্রকল্পের অগ্রগতি মাত্র ১০ শতাংশ।

বিশ্ববিদ্যালয়টির পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগের পরিচালক ড. কাজী একিউএম মহিউদ্দিন এ বিষয়ে বণিক বার্তাকে বলেন, গত বছরের বরাদ্দের প্রায় ৭০ শতাংশ কাজ করা সম্ভব হয়েছে। বাকি ৩০ শতাংশ কাজ করোনার কারণে ব্যাহত হয়েছে। নির্দিষ্ট সময়ে কাজ শেষ করতে পারা সম্ভব হবে না বিধায় এরই মধ্যে উন্নয়ন ব্যয় বাড়ানোর জন্য আবেদন করা হয়েছে।

২০১৮ সালের অক্টোবরে ‘কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকতর উন্নয়ন’ নামে ১ হাজার ৬৫৫ কোটি ৫০ লাখ টাকার অনুমোদন দেয় একনেক, যা ২০১৮ সালের নভেম্বরে শুরু হয়ে ২০২৩ সালের জুনে শেষ করতে হবে। তবে প্রকল্পের অগ্রগতি মাত্র ২০ শতাংশ। এ বিষয়ে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এমরান কবির চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ভূমি অধিগ্রহণ নিয়ে জটিলতার কারণে প্রকল্পটি এগিয়ে নেয়া সম্ভব হয়নি। তবে কিছুদিন হলো এ জমি অধিগ্রহণের কাজ শেষ হয়েছে। আর্থিক কার্যক্রম সম্পন্ন হলে অগ্রগতি আরো বেশি হবে। প্রকল্পের দায়িত্ব সেনাবাহিনী নেয়ার পর কার্যক্রমে দ্রুত অগ্রগতি হচ্ছে। চলতি বছরে প্রকল্পের দৃশ্যমান উন্নয়ন করা সম্ভব হবে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেরিটাইম ইউনিভার্সিটি স্থাপনে ১ হাজার ১৮৩ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। তবে দুই বছরে বিভিন্ন সমন্বয়হীনতায় অবকাঠামোগত উন্নয়ন সেভাবে করা সম্ভব হয়নি। ফলে প্রকল্পের অগ্রগতি এখনো ১০ শতাংশের নিচে। প্রশাসনের কর্মকর্তা বলছেন, কভিড-পরবর্তী সময়ে দ্রুতগতিতে কাজ এগিয়ে চলছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ হবে বলে আশা করছেন তারা।

পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০১৮ সালে শুরু হওয়া ৪৮০ কোটি ৬০ লাখ টাকার প্রকল্পের মাধ্যমে একটি ১০ তলা প্রশাসনিক ভবন, দুটি ১২ তলা একাডেমিক ভবন, ছাত্রদের একটি ১০ তলা ও ছাত্রীদের একটি ১০ তলা আবাসিক হল, একটি চারতলা টিএসসি, একটি চারতলা কনভেনশন সেন্টার, একটি কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারসহ বেশকিছু কার্যক্রম করা হবে।

এ প্রকল্পের কাজের অগ্রগতির বিষয়ে জানতে দুদিনে পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম রুস্তম আলীর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও প্রকল্পের বাস্তবায়ন হারের বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না বলে বণিক বার্তাকে বলেন।

সূত্রঃ বণিক বার্তা

ইউটিউবে আমাদের চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন: