উপচেপড়া দর্শনার্থীর ভিড়ে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে আশাজাগানিয়া হলুদ পদ্ম। কুমিল্লার সীমান্তবর্তী বুড়িচং উপজেলার দক্ষিণগ্রাম এলাকায় বিলে প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা নতুন জাতের হলুদ পদ্মের সন্ধান পাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে প্রতিনিয়ত সেখানে বাড়ছে উৎসুক মানুষের ভিড়। বিশদ গবেষণার জন্য গবেষকরা যখন একটু নিরিবিলি পরিবেশ চাইছেন, গ্রামবাসী ও প্রশাসনের কাছে বিলটি সংরক্ষণের আহ্বান জানিয়েছেন- তখন দর্শনার্থীর উপচেপড়া ভিড় ও নৌকার মাঝিদের বেপরোয়া ফুল ছেঁড়া, যত্রতত্র নৌকা চালানোয় হলুদ পদ্মের সঙ্গে পুরো পদ্মবিলই অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। বহু স্থান হয়ে পড়েছে ফুলশূন্য। শরতের এই সময়ে বিলজুড়ে ফুলের সমাহার থাকার কথা; কিন্তু তার অনেকটাই হারিয়ে গেছে।

বর্তমানে বিলে অবস্থান করা নতুন জাতের পদ্মের গবেষক দলের অন্যতম সদস্য সিকদার এ কে শামসুদ্দিন বলেন, ‘বিলের বর্তমান অবস্থা দেখে আমি মর্মাহত। গত ৫ সেপ্টেম্বর বেশ কিছু তথ্য-উপাত্ত নিয়ে আমি ঢাকা যাই এবং ১৩ সেপ্টেম্বর ফিরে আসি। এর মধ্যেই দেখি, পুরো বিল তছনছ করে ফেলা হয়েছে। ৩০-৪০টা নৌকা ঘুরছে, ইচ্ছামতো পদ্ম ছিঁড়ছে।’ দেশের বাইরে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে আফসোস করে তিনি বলেন, ‘এমনটা অন্য কোনো দেশে হলে পুরো বিলটিই সংরক্ষণ করা হতো। কিন্তু আমাদের দেশের মানুষকে এর গুরুত্বই বোঝানো যাচ্ছে না। এভাবে চলতে থাকলে গবেষণার জন্য জরুরি পদ্মের বীজ সংগ্রহ অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।’

উপজেলার রাজাপুর ইউনিয়নের দক্ষিণগ্রামের পদ্মবিলটির পূর্বে পাল্ডি, পশ্চিমে রাজাপুর, দক্ষিণে গাজীপুরের অবস্থান। প্রায় ২৫ একরের এই বিলে মে মাসে বৃষ্টি হওয়ার পরপরই ফুল ফোটা শুরু হয়। জুন-জুলাইতে বৃষ্টির পানি যতই বাড়তে থাকে, বিলের পদ্মফুল তখন বেশি করে ফোটে; আর আগস্ট-সেপ্টেম্বরে শরতে বিলের চারদিকে ছিল শুধু পদ্মফুলের ছড়াছড়ি। বিলের পাশেই কথা হয় দক্ষিণগ্রামের ৭৫ বছর বয়সী সামাদ মাস্টারের সঙ্গে। তিনি জানান, ব্রিটিশ আমল থেকেই এই বিলে পদ্মফুল ফুটে আসছে, তবে তা ছিল সামান্য। স্বাধীনতার পরপর ফুল ফোটার সংখ্যা বাড়তে থাকে। তিনি আরও বলেন, চলতি শতকের শুরুতে হঠাৎ এই বিলে পদ্মফুল ফোটা বন্ধ হয়ে যায়। টানা ১৭ বছর পর ২০১৮ সালে আবারও বিলে কিছু পদ্মফুল ফোটে। ২০১৯ সালে বিলজুড়ে পদ্মফুল দেখা দেয়। এ সময় গবেষকরা হলুদ পদ্মের সন্ধান পেলে গবেষণার জন্য স্থানীয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার উদ্যোগে ওমর ফারুক নামে স্থানীয় এক ইউপি সদস্যসহ ১১ সদস্যবিশিষ্ট ‘পদ্মবিল সংরক্ষণ কমিটি’ গঠন করা হয়।

দক্ষিণগ্রামের খামারের মালিক ষাটোর্ধ্ব মো. ইব্রাহিম জানান, এই বিলের অধিকাংশ জমির মালিক তাদের গ্রামের লোকজন। বিগত সময়ে পদ্মফুল কমে যাওয়ায় শুস্ক মৌসুমে চাষাবাদের সময় যখনই বিচ্ছিন্নভাবে জমিতে পদ্মফুলের অস্তিত্ব চোখে পড়েছে, তখনই তারা সেগুলো সংরক্ষণের চেষ্টা করেছেন। এ বছর আগস্টের শেষ সপ্তাহে বিলে পদ্মফুল ফোটার সংবাদ পেয়ে আবার ঢাকা থেকে একটি বিশেষজ্ঞ দল আসে দক্ষিণগ্রাম এলাকায়। এ সময় সপ্তাহ ধরে তারা বিলটি পরিদর্শন করেন, বিশেষত বিলের হলুদ পদ্মফুলের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে নানামুখী ব্যবস্থা নেন। এর মাঝে বিশেষ বিশেষ স্থানে লাল পতাকা টাঙিয়ে সংরক্ষিত স্থান নির্ধারণ করে দেন। পরবর্তী সময়ে স্থানীয় কিছু যুবক নৌকার ব্যবসায়ী ও মাঝিদের যোগসাজশে লাল পতাকার কিছু খুঁটি তুলে ফেলে এবং কিছু খুঁটি বিলের দক্ষিণ ও পশ্চিম পাশে সরিয়ে দেয়। তিনি আরও জানান, নৌকার মাঝিরা বিলের ফুল যেভাবে পারছে ছিঁড়ে দর্শনার্থীর হাতে তুলে দিয়ে নগদ টাকা কামিয়ে নিচ্ছে। একইভাবে দর্শনার্থীরাও পদ্মফুল ছিঁড়ছে। এতে এবার খুব অল্প সময়ে বিল থেকে ফুলের সংখ্যা কমে গেছে। তিনি সুষ্ঠুভাবে বিলটি সংরক্ষণে প্রশাসনের সহযোগিতা কামনা করেন।

রাজাপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান গোলাম মোস্তফা বলেন, বিলটি দ্রুত সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। এ বিষয়ে আমরা চেষ্টা করছি। কিন্তু নানাভাবে নতুন এ পদ্মের খবর ছড়িয়ে পড়ায় তাদের ঠেকিয়ে রাখা কষ্টকর।

বিলের বর্তমান অবস্থা বিষয়ে জানতে চাইলে বুড়িচং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইমরুল হাসান জানান, বিলটির নতুন এই পদ্মফুল নিয়ে নিরবচ্ছিন্ন গবেষণার জন্য এরই মধ্যে পুলিশ, স্থানীয় চেয়ারম্যান-মেম্বারসহ গণ্যমান্য ব্যক্তির সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, দর্শনার্থী যদি সচেতন না হয়, তাহলে এই বিল সংরক্ষণ করা সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে দর্শনার্থীদেরও এগিয়ে আসার অনুরোধ জানান তিনি।

ইউটিউবে আমাদের চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন: