সমাজের বড় মাথাগুলো একসাথে বসে দশম শ্রেণির ছাত্রী ফাহিমাকে মসজিদের হুজুর ডেকে এনে বিয়ে দিলেন। বললেন এখন কবুল বললেই হলো। পরে কাবিন করে নিবে। সমাজের মাথা বলে কথা! বলা চলে, ফাহিমাকে একরকম তার ইচ্ছের বিরুদ্ধেই বিয়ে দেয়া হয়।

এবিয়ে নিয়ে ফাহিমার বাবা-মাও ছিল নিরুপায়। কেননা বিয়ের তিন দিন আগে ফাহিমাকে অপহরণ করে ফয়সাল। তারপর ফাহিমাকে বিয়ে দিতে হবে এমন অঙ্গিকার নিয়ে তাকে তার বাড়ি পৌঁছে দিয়ে একঘন্টা পরই সমাজের মাথাগুলো নিয়ে কাবিন ছাড়াই বিয়ের আয়োজন করে ফয়সাল। বিয়ে হলেও কাবিন আর হয়নি। শেষ পর্যন্ত ওই বিয়ের ২৫দিনের মধ্যে ফাহিমা চলে যায় না ফেরার দেশে।

ফাহিমার পরিবারের অভিযোগ, তাদের মেয়েকে শারীরিক নির্যাতন ও পরে বিষ প্রয়োগে হত্যা করা হয়েছে।
ঘটনাটি কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার কোরপাই গ্রামের। স্বামী ও তার পরিবারের লোকজনের নির্যাতনে এবং মেরে ফেলার উদ্দেশ্যে বিষ প্রয়োগের ঘটনায় ঢাকা সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) রাত পৌনে ১২টার দিকে মারা যায় ফাহিমা। ফাহিমার মৃত্যুর পর পরই হাসপাতালে লাশ রেখে পালায় তার স্বামীসহ ওই পরিবারের অন্য সদস্যরা। বৃহস্পতিবার ( ১৭ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় তাকে ওই গ্রামেই পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।

লাশের সুরুত হাল বিষয়ে মোবাইল ফোনে জানতে চাইলে ঢাকা শেরে বাংলা নগর থানার এসআই মোবারক আলী জানান, প্রাথমিকভাবে নিহতের মুখে বিষের আলামত পাওয়া গেছে।

ফাহিমার পরিবার ও গ্রামবাসী সূত্রে জানা যায়, কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার মোকাম ইউনিয়নের কোরপাই গ্রামের জাহাঙ্গীরের মেয়ে ফাহিমা স্থানীয় নিমসার উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্রী। সে ২০২১ সালের এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিল। স্কুলে আসা-যাওয়ার পথে একই গ্রামের ফজলু মিয়ার ছেলে নিমসার বাজারের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ফয়সাল (২২) নানাভাবে ফাহিমাকে উত্যক্ত করতো। গত ২২ আগষ্ট সকালে ফাহিমাকে অপহরণ করে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যায় ফয়সাল। খোঁজাখুজি করে ফাহিমাকে না পেয়ে ২৩ আগষ্ট বুড়িচং থানায় অভিযোগ করেন তার পিতা জাহাঙ্গীর। থানায় অভিযোগের খবর পেয়ে অপহরণকারী ফয়সালের পিতা ফজলু মিয়া,বড় ভাই সাদ্দামসহ গ্রামের কিছু লোক জাহাঙ্গীরের বাড়িতে এসে ফাহিমাকে ফিরিয়ে দেয়ার অঙ্গীকার করে ফয়সালের সাথে বিয়ে দেয়ার সম্মতি আদায় করে নেয় অনেকটা কৌশলে।

২৫ আগষ্ট রাত ৮টায় ফাহিমাকে তার বাবা-মায়ের কাছে পাঠিয়ে প্রায় এক ঘন্টা পর রাত ৯ টার দিকে সমাজের কয়েকজন বড় মাথার (মাতব্বর প্রকৃতির)) লোক নিয়ে মসজিদের হুজুর ডেকে কাবিন ছাড়াই মুখে মুখে বিয়ের কাজ সম্পন্ন করেন। আর সমাজের মাথাগুলো বললেন আগামী ৫ দিনের মধ্যে কাবিনসহ যাবতীয় আনুষ্ঠনিকতা সম্পন্ন করা হবে।
কিন্তু কাবিন আর হয়না। কাবিনের বদলে ফাহিমার উপর চলে শারীরিক নির্যাতন। এভাবেই চলতে থাকে স্কুল ছাত্রী ফাহিমার বৈবাহিক জীবন। তার পরিবারের লোকজনও মেয়ের উপর এমন অত্যাচার ধেখে নির্বাক। কারন সমাজের মাথাওয়ালা লোকগুলোই সব সিদ্ধান্ত দেন।

১৩ সেপ্টেম্বর সকালে জাহাঙ্গীর মিয়ার বড় মেয়ে শারমিন হাওলাত নেয়া দশ হাজার টাকা ফেরত চায় ফাহিমার স্বামী ফয়সালের কাছে। আর নিয়ে শুরু হয় ফাহিমার ওপর নির্যাতন। একপর্যায়ে তার মুখে বিষ ঢেলে দেয়া হয়। এমন অভিযোগ ফাহিমার পরিবারের।

এসব অত্যাচারে ফাহিমার অবস্থা খারাপ হয়ে পড়লে তাকে দুইদিন রাখা হয় চান্দিনা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। এর পর ১৬ সেপ্টেম্বর তার অবস্থার অবনতি ঘটলে তাকে নেয়া হয় ঢাকা সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে। সেখানে রাত ১১টায় ভর্তির একঘন্টার মধ্যেই মারা যায় ফাহিমা। এরপরই লাশ ফেলে পালায় ফয়সাল ও তার ভাইসহ পরিবারের অন্যরা।

খবর পেয়ে ওই রাতেই ঢাকা রওয়ানা হয় ফাহিমার পরিবারের লোকজন। বৃহস্পতিবার ময়না তদন্ত শেষে বিকালে কোরপাই গ্রামে লাশ নিয়ে আসার পর সন্ধ্যায় পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

এঘটনায় নিহত ফাহিমার পরিবারের পক্ষ থেকে হত্যার অভিযোগ এনে ফয়সাল ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে মামলার প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে।

ইউটিউবে আমাদের চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন: