সাংবাদিক মহিউদ্দিন সরকার নাইম কাজ করতেন আনন্দ টিভিতে। কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা প্রতিনিধি ছিলেন তিনি। পরে কাজ শুরু করেন কুমিল্লা থেকে প্রকাশিত ‘কুমিল্লার ডাক’ পত্রিকায়।

মাদকের বিরুদ্ধে সব সময় সোচ্চার ছিলেন এই সাংবাদিক। গত ছয় মাসে তিনি মাদকের অন্তত ১০টি বড় চালান ধরিয়ে দিতে ভূমিকা রাখেন। এ কারণে তিনি মাদক কারবারিদের টার্গেট হন। মাদক কারবারিরা ঘোষণা দিয়েছিল- মহিউদ্দিনকে পেলেই মেরে ফেলা হবে।

বুধবার রাতে মাদকের একটি বড় চোরাচালানের খবর পান সাংবাদিক মহিউদ্দিন। মূলত এটি ছিলো মাদক কারবারিদের একটি ফাঁদ। সেই ফাঁদে পা দিয়ে গুলিতে প্রাণ হারাতে হয়েছে তাকে।

কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার শংকুচাইল এলাকা-সংলগ্ন সীমান্তবর্তী হায়দ্রাবাদনগর গ্রামে বুধবার রাত ১০টার দিকে ফোন করে ডেকে নিয়ে সংঘবদ্ধ মাদক কারবারিরা মহিউদ্দিনকে পিটিয়ে ও গুলি করে হত্যা করে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই গ্রামের অন্তত দশজন নিউজবাংলাকে এসব কথা বলেন। একই কথা বলেন নিহত মহিউদ্দিনের বন্ধু পলাশ। বুধবার রাতে ঘটনার সময় কোনোরকমে প্রাণে বেঁচে ফিরেন পলাশ। এসে ওই ঘটনার রোমহর্ষক বর্ণনা দেন তিনি।

পলাশ বলেন, ‘মাদকের একটি বড় চালান দেশে ঢুকবে- এমন খবর পেয়ে আমি ও মহিউদ্দিন ভাই হায়দ্রাবাদনগর গ্রামে যাই। গ্রামে পৌঁছার এক মিনিটের মধ্যেই অন্তত ৩০ জনের একটি দল আমাদের ঘেরাও করে। এ সময় মাদক কারবারি মো. রাজু কোমর থেকে পিস্তল বের করে মহিউদ্দিন ভাইকে লক্ষ্য করে কয়েক রাউন্ড গুলি ছোড়ে। গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনি মাটিয়ে লুটিয়ে পড়েন। এ সময় তার মোটরসাইকেলও ভাংচুর করা হয়। এই ফাঁকে আমি কোনোরকমে পালিয়ে আসি।’

মহিউদ্দিন ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার মালাপাড়া ইউনিয়নের অলুয়া গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা মোশারফ সরকারের ছেলে। তিনি কুমিল্লা সেনানিবাস এলাকায় পরিবার নিয়ে বাস করতেন।

সীমান্ত দিয়ে মাদক চোরাচালানের কোনো খবর পেলেই মহিউদ্দিন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটের কাছে তা পৌঁছে দিতেন। তিনি ফেসবুকে নিজের আইডি থেকে সবসময় মাদকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন পোস্ট দিয়ে নিজের অবস্থান জানান দিতেন। এজন্য অনেকে তাকে পুলিশের সোর্স বলেও আখ্যায়িত করতেন।

বুড়িচং প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক জহিরুল হক বাবু বলেন, ‘সাংবাদিক মহিউদ্দিন সব সময় মাদকের বিরুদ্ধে লেখালেখি করতো। এ কারণে মাদক কারবারিরা তাদের পথের কাঁটা সরিয়ে দিতে মহিউদ্দিনকে হত্যা করে। আমরা এই হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের আটক ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।’

বুধবার রাতে মহিউদ্দিনকে যখন বুড়িচং থানায় আনা হয় তার আগে পথেই তার মৃত্যু হয়। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক মুজাহিদুল ইসলাম বলেন, তার শরীরে অন্তত পাঁচটি গুলির চিহ্ন রয়েছে। তবে ময়নাতদন্তের পর বিস্তারিত যানা যাবে।

এদিকে ছেলে হারিয়ে শোকে মুহ্যমান বাবা মোশারফ সরকার বলেন, ‘মাদক কারবারে বাধা দেয়ায় আমার ছেলের পেছনে বহু আগে থেকেই শত্রু লেগে ছিল। ওকে বহু বার সাবধান করেছি। কিন্তু শোনেনি। মাদকের বিরুদ্ধে কথা বলার কারণেই আমার ছেলেকে খুন করা হয়েছে। আমি খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’

এদিকে বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টায় মহিউদ্দিনের মা নাজমা আক্তার বুড়িচং থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। মামলায় মাদক কারবারি মো. রাজুসহ তিনজনের নাম উল্লেখ করা ছাড়াও ৫/৬ জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে।

মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে বুড়িচং থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আলমগীর হোসেন বলেন, ‘আমরা তদন্তের স্বার্থে এ মুহূর্তে আসামিদের নাম প্রকাশ করতে চাই না। সবার সহযোগিতা পেলে দ্রুতই আসামিদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হবে।’

ইউটিউবে আমাদের চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন: