বশিরুল ইসলাম: করোনা মহামারির এই সময়টাতে চিকিৎসা সেবা নিতে আসার রোগীর সংখ্যা কমেছে কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। আগে যেখানে হাসপাতালের জরুরি বিভাগসহ বিভিন্ন ওয়ার্ডে যেরকম রোগী ও স্বজনদের ভিড় লেগে থাকতে- এখন সে দৃশ্য প্রায় অনেকটাই বদলে গেছে। রোগী নেই; তাই বদলে গেছে চিরাচরিত কুমেক হাসপাতাল প্রাঙ্গণের চিত্র। কেনো কমছে রোগী- এর অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে বেশ কিছু কারণ।

জানা গেছে, প্রায় সময়ই দীর্ঘক্ষণ হাসপাতালে অপেক্ষা করেও চিকিৎসকের দেখা পান না রোগীরা। আবার দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে হয় সিরিয়ালের জন। কিন্তু দীর্ঘক্ষণ দাড়িয়ে থেকে সিরিয়াল পেলেও চিকিৎসক আসার পর অনেকেই তাঁর সাক্ষাৎ/পরামর্শ পান না। করোনাকালে হাসপাতালটিতে কোভিড-১৯ ইউনিট স্থাপনের পর হাসপাতালের পাশে করোনা রোগী ও তার স্বজনদের আনাগোনা বেড়ে গেছে। সংক্রমণসহ নানা কারণে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এখন আগের মত রোগী আসে না এবং আসতে চায়ও না।

এছাড়াও অভিযোগ রয়েছে, হাসপাতালের অনেক চিকিৎসকই দেরি করে আসেন আবার চলে যান দ্রুত। চিকিৎসকদের সকাল ৮টা থেকে ১টা পর্যন্ত ডিওটি পালন করার কথা থাকলেও এমন চিকিৎসকও আছেন যিনি আসেন ১০টায় আবার চলে যায় ১২টার মধ্যে। যার কারণে স্বল্প সময়ে সব রোগী তাড়াহুড়ো করে দেখে রোগীর বক্তব্য ভালভাবে না শুনে ঔষধ লিখে দেন। বেশি কথা বলার সুযোগ না দিয়ে দ্রুত হাতে ধরিয়ে দেন ব্যবস্থাপত্র।

রোগী আসছে না কুমেক হাসপাতালে!সরেজমিনে হাসপাতাল ঘুরেও চোখে পড়েছে এমন চিত্র। গত ১৬ জুলাই বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ঘুরে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বহি: বিভাগে এসব তথ্য অবলোকন করেছেন এ প্রতিবেদক। কথা বলেছেন সেবা নিতে আসা রোগী ও স্বজনদের সাথে।

কুমিল্লা জেলার বরুড়া উপজেলার কেমতলীর বাসিন্দা আইয়ুব আলী ( ৫৪) দাঁতের সমস্যা নিয়ে সকাল ৮টায় হাসপাতালে এসেছেন। বেলা ১০টা বেজে গেলেও ডাক্তারের কোন দেখা পাচ্ছেন না তাই তিনি দরজার সামনে চেয়ারে বসে ডাক্তারের অপেক্ষা করছেন। একই রকম ভাবে জেলার আদর্শ সদর উপজেলার চর্থার বাসিন্দা সালেহা বেগম (৪৫), বারপাড়ার বাসিন্দা খোরশেদা বেগম (৫৩), চৌদ্দগ্রামের জসিম উদ্দিন (২৭) নোয়াখলী সোনাইমুড়ীর ফারিয়ার (২) স্বজনরা সেই সকাল ৮টা থেকে বিভিন্ন ওয়ার্ডের সামনে অপেক্ষা করছেন ডাক্তারের জন্য। কিন্তু ১০টা বেজে গেলেও ডাক্তারের দেখা মিলছেনা। সাড়ে ৯টায় ১২৪ নং কক্ষে ডা. সাগর চক্রবর্তীকে পাওয়া যায় পুরুষ চর্ম বহি: বিভাগে। কিন্তু ঘড়ির কাটা ১০ বেজে গেলেও মহিলা চর্ম বহি: বিভাগে কাউকে পাওয়া যায়নি। ১২২ নং কক্ষে চর্ম ও যৌন বিভাগে টেবিলে খাতা বাতাসে উড়ছে, ফ্যান ঘুরছে আর লাইট জলছে কিন্তু সেখানে ও কেউ নেই। সামনে রোগী সাড়ি সাড়ি। একই অবস্থা ১২১নং মানুষিক, ১২০নং চক্ষু, ১১৯নং আবাসিক সার্জন চক্ষু, ১১৮নং দন্ত, ১১৭নং কনসালটেন্ট দন্ত, ১১৬নং দন্ত বহি: , ১১৫নং দন্ত বহি: ও ১১৩, ১১৪ নাক, কান ও গলা বিভাগে।

দন্ত বহি: বিভাগ ১১৩ নাম্বার কক্ষে গিয়ে পাওয়া যায় ওয়ার্ড বয় মহসিন মিয়াকে। তিনি জানান, ডাক্তার ১০টার মধ্যে চলে আসবে। রোগীদের নাম লিখে সিরিয়াল করে রাখতেছি। ডাক্তার আসা মাত্রই সিরিয়াল অনুযায়ী রোগী দেখবেন। পরে ডাক্তার ৯টা ৫৫মি: কক্ষে প্রবেশ করেন।
দন্তুবিভাগের সামনে ডেন্টাল সার্জনের সহকারী বা ওয়ার্ড বয় অরুন চন্দ্র দাশ (০১৮২৯-৯০৯০৬৪) জানান, স্যার কিছুক্ষনের মধ্যে এসে পরবেন। এখন কয়টা বাজে জানতে চাইলে তিনি জানান দশটা বাজে । স্যার অতি শীঘ্রই চলে আসবেন।

রোগী ও তাদের স্বজনদের সাথে কথা বলে জানা যায়, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তারা আগে কয়েকবার এসেছেন। দীর্ঘদিন অসুস্থ্য থাকার কারণে প্রাইভেট হাসপাতালে কয়েকগুন টাকা বেশি দিয়ে ডাক্তার দেখিয়ে আর পারছেননা। তারা অনেকটা বাধ্য হয়েই কুমেক হাসপাতালে ডাক্তার দেখাতে এসেছেন। কিন্তু এখানে এসেও নানা বিড়ম্বনায় পরতে হয়েছে তাদেরকে। সেই সকাল ৮টা থেকে ডাক্তারের জন্য অপেক্ষা করছেন। কখন ডাক্তার আসবে তা বলতে পারছেন না। ওয়ার্ড বয়রা বলছেন ডাক্তার আসবেন কিন্তু কখন আসবেন তা বলতে পারছেননা।

ডাক্তার দেখানোর পর রোগীকে ঔষধ লিখে দিলেও সরকারি কোন ঔষধের স্লিপ দেননা। তবে রোগী চাইলে বিনা মূল্যের ঔষধের স্লিপ দেন বলে জানিয়েছেন ডাক্তার।

জেলার আদর্শ সদর উপজেলার বারপাড়ার বাসিন্দা খোরশেদা বেগম ১৫ জুলাই বুধবারে হাসপাতালে সাড়ে ১২টায় প্রচন্ড কান ও গলা ব্যথা নিয়ে কাউন্টারে কাউকে না পেয়ে জরুরী বিভাগে টিকেটের জন্য গেলে সেখানে কাউন্টারে উপস্থিত বোরহান, রনজিত ও বিল্লাল জানালেন আগে ডাক্তারের সাথে দেখা করেন তারপর ডাক্তার বল্লে টিকেট দেওয়া হবে অন্যথায় টিকেট দেওয়া যাবে না। জরুরী বিভাগে গিয়ে ডাক্তারকে বিস্তারিত জানালে তিনি রোগীকে বল্লেন আগামীকাল অর্থাৎ বৃহস্পতিবার আপনি বহি: বিভাগে ডাক্তার দেখান। এখানে এই মুহূর্তে ভর্তি করা যাবে না। পরের দিন বৃহস্পতিবার খোরশেদা বেগম সকাল ৮টায় হাসপাতালে এসে নাক, কান, গলা বিভাগে দীর্ঘক্ষন অপেক্ষা করেন।

এছাড়াও অভিযোগ রয়েছে কুমেক হাসপাতালের করোনা ইউনিটে আয়া, কিনারদের অতিরিক্ত টাকা দিতে হয়। করোনা ইউনিটের সামনের গেইটে আনসারদের দায়িত্ব পালনেও অবহেলা রয়েছে যথেষ্ট। যে কেউ চাইলেই প্রবেশ করতে পারে শুধু সাংবাদিক প্রবেশ করতে হলে পরিচালকের অনুমতির প্রয়োজন হয়। বাকীরা যে কেউ অনায়াসে প্রবেশ করতে পারে ও বের হতে পারে।

এ বিষয়ে কুমেক হাসপাতালের পরিচালক ডা. মুজিবুর রহমান জানান, এই হাসপাতালটি করোনা হাসপাতাল হওয়ায় ভয়ে সাধারন মানুষ আসতে চায় না। ডেডিকেটেড হাসপাতাল হওয়ায় সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি আছে বিধায়, এই করোনার সময়ে আমরা জরুরী রোগী ছাড়া অন্য রোগীদের বেশি একটা দেখার সুযোগ নেই। তাছাড়া বহি: বিভাগে একাধিক চিকিৎসক আক্রান্ত হওয়ায় বহি: বিভাগে ডাক্তারদের উপস্থিতি কম। করোনার এই দুর্যোগ সময়ে সাধারণত ডিউটির টাইম ৮টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত। চিকিৎসকরা পালাক্রমে দায়িত্বপালন করে। আমাদের হাসপাতালে সহকারী পরিচালক, ডাক্তার, নার্স, ওয়ার্ডমাস্টার, আয়া কিনারসহ প্রায় ৬০জনের মত আক্রান্ত যার কারণে দায়িত্ব পালনে হিমশিম খেতে হচ্ছে। করোনার কারণে হাসপাতালে পরিদর্শনে না যাওয়ার কারণে হয়তো অনেক ডাক্তার যথা সময়ে উপস্থিত হয়নি। তবে বিষয়টি আপনাদের মাধ্যমে যেহেতু নজরে এসেছে আমরা ডাক্তারদের উপস্থিতির বিষয়টি নিশ্চিত করবো। করোনার কারণে ডাক্তার ও রোগী দূরত্ব বজায় রেখে চিকিৎসা সেবা দেওয়া হচ্ছে তাই রোগীকে কম সময়ে বিদায় করার চেষ্টা করছে ডাক্তাররা। যার কারণে সরকারি ঔষধ লিখতে পারছেনা। তবে আমাদের যথেষ্ট সরকারি ঔষধ সরবরাহ রয়েছে।

ইউটিউবে আমাদের চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন: