ভারতের মত বদলে স্থবির কুমিল্লা-ব্রাহ্মণবাড়িয়া চারলেন প্রকল্প

যৌথ প্রকল্পের উদ্যোগের পর মত পাল্টে ফেলেছে ভারত চারলেন প্রকল্পের আশ্বাসে সাড়ে তিন বছরের সংস্কার বন্ধ ৪০ কিলোমিটার সড়কজুড়ে খানাখন্দ দুর্ঘটনায় তিন বছরে ৯২ প্রাণহানি, আহত দুই শতাধিক প্রকল্পের ব্যায় ধরা হয়েছিল ৭ হাজার ১৮৮ কোটি টাকা
ভারতের অর্থায়ন বন্ধ হয়ে মুখ থুবড়ে পড়েছে কুমিল্লা-ব্রাহ্মণবাড়িয়া মহাসড়কের চারলেন প্রকল্প। যৌথভাবে প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ শুরু হলেও রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের মত পাল্টে ফেলে ভারত। ফলে প্রকল্পটি মুখ থুবড়ে পড়েছে। এদিকে চারলেনের আশায় দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় সরু ও বিপজ্জনক বাঁকের এই মহাসড়কে বেড়েছে দুর্ঘটনার সংখ্যা। এতে প্রতিনিয়ত ঘটছে প্রাণহানি। দ্রুত সময়ের মধ্যে সড়কটি সংস্কারের দাবি স্থানীয়দের।
‘সাধারণ মানুষ দীর্ঘদিন ধরে অবর্ণনীয় দুঃখ-দুর্দশার মধ্য দিয়ে যাতায়াত করছে। বর্তমানে মহাসড়কটি মারণফাঁদে পরিণত হয়েছে। গত দুই বছরে এই মহাসড়কে দুই শতাধিকেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন দুই হাজারেরও বেশি। প্রতিদিন দীর্ঘ যানজটের ফলে মানুষের ভোগান্তি বাড়ছে ও গুরুত্বপূর্ণ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। আমরা চাই দ্রুত সময়ের মধ্যে মহাসড়কটি সংস্কারের ব্যাপারে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হোক।’
সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের তথ্য মতে, আঞ্চলিক যোগাযোগ ও পণ্য পরিবহনে সড়কটি গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় ২০২২ সালের ১৩ সেপ্টেম্বরে মহাসড়কটি চারলেনে উন্নীতকরণের জন্য একনেক সভায় অনুমোদন পাশ হয়। বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ অর্থায়নে ৭ হাজার ১৮৮ কোটি ৬৬ লাখ টাকা ব্যয়ে এ মহাসড়কের কুমিল্লার ময়নামতি থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ধরখার পর্যন্ত ৫৪ কিলোমিটার সড়ক চারলেনে উন্নীতকরণের প্রকল্প হাতে নেয় জাতীয় মহাসড়ক বিভাগ। এর মধ্যে সরকারি তহবিল থেকে ৪ হাজার ৩৭৮ কোটি টাকা ও ২ হাজার ৮১০ কোটি টাকা ভারত থেকে ঋণ নেওয়ার কথা ছিল।
জানা যায়, প্রকল্প বাস্তবায়নে অধিগ্রহণ কার্যক্রম শুরুর আগেই তড়িঘড়ি করে কেটে ফেলা হয় মহাসড়কের কুমিল্লা অংশের শতবর্ষী প্রায় ৮ হাজার গাছ। গাছ কাঁটা ছাড়া তখনও সড়ক উন্নয়নে দৃশ্যমান কোনো কর্মকাণ্ড ছিল না। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ভারতের যৌথ অর্থায়ন বন্ধ হওয়ায় স্থবিরতা নেমে আসে পুরো প্রকল্পে। ২০২৬ সালের জুনে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এর নির্দিষ্ট সময়ের আগে অর্থ সংকটে স্থবির হয়ে পড়ায় প্রকল্প বাস্তবায়ন ও সড়ক সংস্কারে দাবিতে অবরোধ করেন ভুক্তভোগীরা। সড়ক সংস্কারের আশ্বাস দিলেও চারলেন প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকারের সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে আছে সড়ক বিভাগ।
‘আমাদের অধিগ্রহণ কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এ বিষয়ে নতুন কোনো নির্দেশনা নেই। তবে ভারতীয়দের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে, তারা এই প্রকল্পে বিনিয়োগ করবে না বলে আমাদের জানিয়েছে। চারলেন প্রকল্প বাস্তাবায়নে এখন সরকার সিদ্ধান্ত দেবে, বিকল্প বিনিয়োগকারী খুঁজবে নাকি সরকারি অর্থায়নে এটি বাস্তবায়ন হবে। সেই সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছি আমরা।’
এদিকে চারলেনে উন্নীত হবে এমন আশ্বাসে ২০২২ সাল থেকে বন্ধ রয়েছে এই মহাসড়কের সংস্কার কাজ। দীর্ঘদিনের সংস্কারের অভাবে গর্ত ও খানাখন্দে মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কটি। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সংকীর্ণ এই সড়কে বৃদ্ধি পেয়েছে কয়েকগুণ যানবাহন। এতে তীব্র যানজটে প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা সড়কে আটকে থাকতে হচ্ছে চলাচলকারীদের।
জানা যায়, গত ৩ বছরে কুমিল্লার অংশে ৪০ কিলোমিটার সড়কে ১০৭টিরও বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে। হাইওয়ে পুলিশের তথ্য মতে, এসব দুর্ঘটনায় ৯২টি প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। আহত হয়েছে প্রায় দুই শতাধিক। তবে দেড় শতাধিক মানুষের প্রাণহানি হয়েছে দাবি স্থানীয়দের।
সড়ক বিভাগ বলছে, দ্রুত সময়ের সড়ক মেরামতে হাত দেওয়া হবে। তবে কুমিল্লা-সিলেট মহাসড়কটি চারলেনে উন্নীতকরনের কাজ শুরুর সিদ্ধান্ত সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের। দুইলেনের সড়কটি চারলেনে উন্নীত হলে দুর্ঘটনার পরিমাণ যেমন কমবে, তেমনি কুমিল্লা ও চট্টগ্রামের সঙ্গে সিলেট ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত হবে। এছাড়া আখাউড়া স্থলবন্দর থেকে মালামাল নিয়ে এ সড়ক ব্যবহার করবে বিভিন্ন পণ্যবাহী পরিবহন।
এদিকে এই সড়কে নির্বিঘ্নে চলাচলের একদফা দাবিতে গত ২৭ আগস্ট নিয়মিত চলাচলকারীরা আঞ্চলিক মহাসড়কের ময়নামতি থেকে কোম্পানীগঞ্জ পর্যন্ত একযোগে অবরোধ করে ৯টি পয়েন্ট মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন। এতে অংশ নেন ব্যবসায়ী, পেশাজীবী, রাজনীতিবিদ, ছাত্র-জনতা এবং এ সড়কে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো ব্যক্তিদের স্বজনরাও। পরে সড়ক বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসনের সংস্কারের আশ্বাসে সড়ক ছাড়েন তারা। এরপর প্রায় ধীর্ঘ এক মাস অতিবাহিত হলেও সড়ক ও জনপথ (সওজ) কর্তৃপক্ষ সংস্কার কাজে হাত না দেওয়ায় পুনরায় গত ২৩ সেপ্টেম্বর কুমিল্লা জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি দেওয়া হয়।
বুড়িচং উপজেলা বিএনপির সাবেক ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক মোহাম্মদ সাখাওয়াত হাফিজ বলেন, চারলেন প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা বলে গত ২ বছরে মহাসড়কের পাশ থেকে শতবর্ষীসহ কয়েক হাজার গাছ কাটা হয়েছে। এরপর প্রকল্পটি বাস্তবায়নে সওজের কোনো অগ্রগতি দেখছি না। বর্তমানে এই সড়কে খানাখন্দে যাতায়াতকারীদের দুর্ভোগ চরমে। প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা। গত ৫ মাসে শুধু ময়নামতি এলাকায় অন্তত ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, মহাসড়কে তিন চাকার যান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও পুলিশের সহযোগিতায় অবাধে চলছে। আমাদের দাব, সড়কে তিন চাকার পরিবহন বন্ধ ও দ্রুত সময়ের মধ্যে সড়ক মেরামত করে নির্বিঘ্নে যানচলাচলের উপযোগী করা হোক। অন্যথায় আমরা আবারো সড়ক অবরোধের ডাক দেব।
কুমিল্লা-ব্রাহ্মণবাড়িয়া সড়ক ছয়লেন মহাসড়ক বাস্তবায়ন পরিষদের আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট মো. তাজুল ইসলাম বলেন, বুড়িচং, ব্রাহ্মণপাড়া, দেবিদ্বার ও মুরাদনগর উপজেলার সাধারণ মানুষ দীর্ঘদিন ধরে অবর্ণনীয় দুঃখ-দুর্দশার মধ্য দিয়ে যাতায়াত করছে। বর্তমানে মহাসড়কটি মারণফাঁদে পরিণত হয়েছে। গত দুই বছরে এই মহাসড়কে দুই শতাধিকেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন দুই হাজারেরও বেশি। প্রতিদিন দীর্ঘ যানজটের ফলে মানুষের ভোগান্তি বাড়ছে ও গুরুত্বপূর্ণ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। আমরা চাই দ্রুত সময়ের মধ্যে মহাসড়কটি সংস্কারের ব্যাপারে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
কুমিল্লা-ব্রাহ্মণবাড়িয়া আঞ্চলিক মহাসড়ক প্রশস্তকরণ চারলেন প্রকল্পের ম্যানেজার আশীষ মুখার্জী বলেন, আমাদের অধিগ্রহণ কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এ বিষয়ে নতুন কোনো নির্দেশনা নেই। তবে ভারতীয়দের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে, তারা এই প্রকল্পে বিনিয়োগ করবে না বলে আমাদের জানিয়েছে। চারলেন প্রকল্প বাস্তাবায়নে এখন সরকার সিদ্ধান্ত দেবে, বিকল্প বিনিয়োগকারী খুঁজবে নাকি সরকারি অর্থায়নে এটি বাস্তবায়ন হবে। সেই সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছি আমরা।
কুমিল্লা সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী খন্দকার গোলাম মোস্তফা বলেন, গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কে নির্বিঘ্নে চলাচল ও যাত্রীদের দুর্ভোগ কমাতে মধ্যমেয়াদী সময়ের জন্য দ্রুত সংস্কারকাজ শুরু করা হবে। ফান্ডিং জটিলতায় প্রকল্পটি স্থবির হয়ে পড়েছে। তবে সরকার থেমে নেই। ইতোমধ্যে বাস্তবায়নে জন্য বিকল্প বিনিয়োগকারী খুঁজছে সরকার। আশা করি এটিরও সামাধান হবে। নিদের্শনা পেলে পরবর্তীতে প্রকল্প বাস্তবায়নে কাজ শুরু করা হবে। মহাসড়কটি ৩৪ দশমিক ৬ মিটার প্রশস্ত হবে। এর সুফল হিসেবে আখাউড়া স্থলবন্দর থেকে মালামাল নিয়ে এ মহাসড়ক ব্যবহার করবে বিভিন্ন পণ্যবাহী বাহন।
কুমিল্লা জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. আমিরুল কায়ছার বলেন, কুমিল্লা-ব্রাহ্মণবাড়িয়া মহাসড়ক প্রকল্প বাস্তবায়নে জমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া অনেক দূর এগিয়েছে। তবে সম্প্রতি অজ্ঞাত কারণে প্রকল্পটির অর্থায়ন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আমরা বিকল্প অর্থায়নের সন্ধানে রয়েছি।
