স্বামী-সংসার সন্তান আগলে রেখে করোনা প্রতিরোধে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন পাঁচজন নারী। নিজের উপজেলাকে করোনা সংক্রমন রোধে এই নারী কর্মকর্তারা দিনরাত বিরামহীন কাজ করে যাচ্ছেন। যার ফলশ্রুতিতে উপজেলা প্রশাসন এখন সাধারন মানুষের আস্থা ও নির্ভরতার প্রতীক হয়ে দাড়িয়েছে। কথা হয় ওই পাঁচ নারী কর্মকর্তাদের সাথে। তারা জানান তাদের দায়িত্বের কথা। কর্মক্ষেত্রে তাদের কঠিন সময় পার করার কথা। আজ পাঠকদের জন্য সেই পাঁচ নারী কর্মকর্তার কাজের চুম্বক অংশ তুলে ধরা হলো।

জাকিয়া আফরিন,সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার: স্বামী কুমিল্লা দেবিদ্বার সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। আর তিনি সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার। স্বামী-স্ত্রী দু’জনেই মাঠে থাকেন। ঘরে থাকে সাড়ে তিন বছর বয়সী ছেলে। বাবা-মা’র জন্য দিনভর উন্মুখ হয়ে থাকে ছেলে। ঘরে আসলে এবং ঘর থেকে বের হওয়ায় সময় নিজেদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হয়। তবুও থেকে যায় ঝুঁকি। তবে এত ঝুঁকিতে থাকলেও দায়িত্ব পালনে অনিহা নেই। দায়িত্ব থেকে পালিয়ে যেতে চান না। আদর্শ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জাকিয়া আফরিন জানান, করোনা সংক্রমনের শুরু থেকে কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি জানান, গত দু’মাস কঠিন সময় পার করছেন। সামনের দিনগুলির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। জনসমাগম বন্ধ করা, বাজার মনিটরিং-করোনা আক্রান্ত রোগীর সার্বক্ষনিক খোঁজ খবর নেয়া, খাদ্য সামগ্রী বিতরন, সভা করা, আইনশৃংখলা বাহিনীর সাথে সমন্বয় করা। এখন পর্যন্ত সদর উপজেলা প্রশাসন ও বিভিন্ন সংগঠন মিলিয়ে সাড়ে ৯ হাজার মানুষজনকে খাদ্য সামগ্রী দেয়া হয়েছে।

লামইয়া সাইফুল-নাঙ্গলকোট উপজেলা নির্বাহী অফিসার: এখন পর্যন্ত নাঙ্গলকোট উপজেলায় কোন করোনা রোগী সনাক্ত হয় নি। এমন সফলতার জন্য উপজেলা নির্বাহী অফিসার লামিয়া সাইফুল উপজেলাবাসীর প্রতি ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। তাদেরকে সচেতন করার আহবান করা হয়েছিলো। উপজেলাবাসী সচেতন হয়েছেন। সামনের দিনগুলির জন্য প্রস্তুতি জানতে চাইলে তিনি জানান, বর্তমান অবস্থাটা ধরে রাখতে চাই। সে জন্য যা করার তা সবই করবো। গুরত্বপূর্ণ সড়কে চেকপয়েন্ট বসানো হয়েছে। এছাড়াও এখন পর্যন্ত ১০ হাজার ১শ মানুষের মাঝে সরকারী খাদ্য বিতরন করা হয়েছে। এছাড়াও মাননীয় অর্থমন্ত্রী নিজের ব্যক্তিগত তহবিল থেকে সাধারণ মানুষের ঘরে খাবার পৌঁছে দিয়েছেন। করোনা শপিং মল বন্ধ রাখতে দোকান মালিক সমিতির সাথে কথা বলবো। আর এভাবেই সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আগামী দিনগুলিতে নাঙ্গলকোটে করোনা সংক্রমন প্রতিরোধে কাজ করে যাবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

ফৌজিয়া সিদ্দিকা, ব্রাহ্মনপাড়া উপজেলা নির্বাহী: করোনায় সংক্রমনে বিপর্যস্ত নিম্ন আয়ের মাানুষজন। তাদের মাঝে খাদ্য সহয়তা প্রদান করা। জনসমাগম বন্ধ ও জনসচেতনতা সৃষ্টিতে হ্যান্ড মাইক হাতে নিয়ে ছুটে চলা। করোনা আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা ব্যবস্থা করা। সবমিলিয়ে গত দুই মাস এভাবেই পার করেছেন। বাসায় এক ছেলে এক মেয়ে। মা মাঠে থাকেন। দায়িত্ব পালনে জীবনের সর্বোচ্চ ঝুঁকি আছে। শুধু নিজের জীবনের ঝুঁকি নয়-পরিবারের সদস্যরাও পড়তে পারেন ঝুঁকিতে। স্পষ্টভাবে এ কথাটা জানেন ব্রাহ্মনপাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার ফৌজিয়া সিদ্দিকা। তবুও মানুষের সেবা-সুরক্ষা নিশ্চিত করতে অনাগত ভবিষ্যতের জন্য আরো সর্তকাবস্থান নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন। উপজেলা নির্বাহী অফিসার ফৌজিযা সিদ্দিকা জানান, বুড়িচং-ব্রাহ্মনপাড়া সংসদীয় আসনের এমপি আবদুল মতিন খসরু এবং জেলা প্রশাসক মো:আবুল ফজল মীরের সার্বিক নির্দেশনায় কাজ করে যাচ্ছেন। এখন পর্যন্ত ২ জন করোনা রোগী সনাক্ত হয়েছিন। একজন চট্টগ্রামে চলে গেছেন। আরেকজন সুস্থ হয়ে উঠেছেন। তবে ব্রাহ্মনপাড়া উপজেলাকে করোনা সংক্রমন প্রতিরোধে তিনি বদ্ধ পরিকর। আর তাই আইনশৃংখলা বাহিনীর সাথে সমন্বয় করে কাজ করে যাচ্ছেন।

মোসাম্মৎ রাশেদা আক্তার, উপজেলা নির্বাহী অফিসার তিতাসঃ করোনা সংক্রমন প্রতিরোধে দিনভর কাজ করেন। বাড়ী যাওয়ার আগে ফোন করেন। যেন ছোট মেয়ে দুটোকে নিরাপদ দূরত্বে রাখা হয়। নিজে ফ্রেশ হয়ে তারপর নিজের সন্তানদের কাছে যান। উর্পিত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি স্বামী সংসার সন্তান আগলে রেখেই গত দু’মাস ধরে করোনা সংক্রমনরোধে কাজ করে যাচ্ছেন তিতাস উপজেলার নির্বাহী অফিসার মোসাম্মৎ রাশেদা আক্তার। বর্তমানে তিতাসে করোনা আক্রান্ত ১১ জন। যার মধ্যে ৭ জন সুস্থ হয়েছেন। বাকিরাও সুস্থ্য হওয়ার পথে। এ পর্যন্ত উপজেলা প্রশাসন থেকে সাড়ে ৮ হাজার মানুষের মাঝে খাবার সামগ্রী বিতরন করা হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোসাম্মৎ রাশেদা আক্তার জানান, আগামী দিনগুলোতে তিতাসে করোনা সংক্রমনরোধে উপজেলা প্রশাসন বদ্ধপরিকর।

তাপ্তি চাকমা,উপজেলা নির্বাহী অফিসার, হোমনাঃ উপজেলা প্রশাসন ও বিভিন্ন সংগঠন মিলিয়ে ২৫ হাজার বেশী মানুষ খাদ্য সহয়তা পেয়েছেন হোমনা উপজেলায়। এখন পর্যন্ত ২ জন আক্রান্ত হয়েছেন। যার মধ্যে ১ জন সুস্থ হয়েছেন। আরেকজন চিকিৎসাধীন আছেন। অন্যান্য উপজেলা থেকে কুমিল্লার হোমনা উপজেলায় করোনা আক্রান্ত কম হওয়ায় নেপথ্যর গল্পটা বললেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার তাপ্তি চাকমা। তিনি বললেন উপজেলাবাসীকে আমরা যেভাবে চলাফেরা করার জন্য আহবান করেছি তারা সেভাবেই চলাফেরা করছেন। এয়াড়াও আইনশৃংখলাবাহিনীর সাথে সমন্বয় করে কাজ করছি। সম্মিলিত প্রচেষ্টার কারনে হোমনায় এখনো করোনা মহামারী রুপ লাভ করতে পারে নি। এমন কঠিন সময়ে নিজের পরিবারের কথাও জানালেন ইউএনও তাপ্তি চাকমা। তিনি জানান, সংসার সামলানো এবং অর্পিত দায়িত্ব পালনে কোথাও ছাড় দেন না। দিনভর কাজ শেষে যখন বাসায় ফিরেন তখন পেছনের দরজায় দিয়ে প্রবেশ করেন। কারন ঘরে যে তার অবুঝ সন্তান রয়েছে। সন্তানের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে আগে ফ্রেশ হন ।

সূত্রঃ আমাদের সময়

ইউটিউবে আমাদের চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন: