চার মাস আগের কথা। স্কুল থেকে বাসায় ফিরছিলো বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী সানি আহমেদ। সড়কের একপাশ থেকে আরেক পাশে যাওয়ার সময় হঠাৎ একটি দ্রুতগতির পিকআপ ভ্যান ধাক্কা দেয় সানিকে। রক্তাক্ত সানি অজ্ঞান হয়ে যায়। পিকআপের চাকায় পিষ্ট হয়ে যায় সানির ডান পা। স্থানীয়রা উদ্ধার করে সানিকে নিয়ে যায় হাসপাতালে।

চিকিৎসকরা জানান, সানির পা ভালো করার জন্য আড়াই থেকে তিন লাখ টাকার প্রয়োজন। বংশীবাদক বাবা রুবেল আহমেদ। বাঁশি বাজিয়ে যা উপার্জন করেন তা দিয়ে সংসার কোন মতে চলে যায়। কিন্তু চিকিৎসার জন্য তার পক্ষে এত টাকার জোগাড় করা সম্ভব নয়। তবুও প্রাণান্তকর চেষ্টা ও স্ত্রীর গহনা বন্ধক রেখে চিকিৎসা খরচ চালিয়ে যান। বাসা পরিবর্তন করে কম ভাড়ার আরেকটি বাসায় উঠেন। শেষের দিকে চিকিৎসকরা জানান, সানির ডান পা সম্পূর্ণ সেরে উঠার জন্য আরো ৯০ হাজার টাকা দরকার। তবে ইতিমধ্যে ছেলের চিকিৎসার জন্য আর কোন উদ্বৃত্ত ছিলো না বাবা রুবেল আহমেদের হাতে।

পুরান ঢাকার বাসিন্দা বংশীবাদক রুবেল আহমেদের এক ছেলে এক মেয়ে। ছেলে সানি আহমেদ দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ে। ক্লাশে ফাস্ট বয়। এইটুকুন বয়সে এত বড় একটি দুর্ঘটনা সহ্য করে হাসপাতালে দিন পার করছে। মায়ের সাথে বলে মা আমি আর দুষ্টুমি করবো না। আমি আমার বোনের সাথে খেলবো। আমি আমার বন্ধুদের সাথে স্কুলে যাবো। বাবা রুবেল সন্তানের মুখে এমন কথাগুলো শুনে আর স্থির থাকতে পারেন নি। নিজের অক্ষমতা ঢাকতেই সম্ভবত মনের বিষাদে বাঁশি নিয়ে বেড়িয়ে যেতেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চারুকারু কলা ইন্সটিটিউটের পাশে বসে মনের দু:খ চেপে রেখে বাঁশি বাজাতেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে বংশী বাদক রুবেলের বাবা লাবু মিয়াও বাঁশি বাজাতেন, বাঁশি বিক্রি করতেন।

এ খবরটি একটি অনলাইন টিভির কল্যাণে চোখে পড়ে কুমিল্লা পুলিশ সুপার মো: সৈয়দ নুরুল ইসলামের। অনলাইন টিভিতে রুবেলের তথ্য প্রামাণ্যচিত্র পরিবেশিত হলো। কিন্তু রুবেলের অস্থায়ী-স্থায়ী ঠিকানা কিংবা যোগাযোগের কোন মাধ্যম ছিলো না। তবুও এই পুলিশ কর্মকর্তা বংশীবাদক রুবেল আহমেদকে খুঁজতে লাগলেন। সবশেষে পেয়েও গেলেন। বুধবার (৩০ অক্টোবর) কুমিল্লা পুলিশ সুপার বংশীবাদক রুবেলকে ডাকলেন। বাবার সাথে ক্রাচে ভর দিয়ে পুলিশ সুপারের কাযার্লয়ে আসলো সানিও।

বংশীবাদক রুবেল আহমেদ যখন তার ব্যাগ থেকে বাঁশি বের করলেন তখন বাঁশিগুলোতে রুবেলে বাবা লাবু মিয়ার স্টিকার লাগানো ছিলো। পুলিশ সুপার সৈয়দ নুরুল ইসলাম ছোঁ মেরে একটি বাঁশি নিয়ে বললেন এত দেখি লাবু মিয়ার বাশি। তুমি কোত্থেকে পেলে। বংশীবাদক রুবেল জানালেন, লাবু মিয়া আবার বাবা। পুলিশ সুপার সৈয়দ নুরুল ইসলাম এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পাশের এই লাবু মিয়ার থেকে রমনার ডিসি থাকাকালীন সময়ে কত যে বাঁশি কিনেছেন!

পরে রুবেলের মুখ থেকে দুর্ঘটনার বিস্তারিত শুনে সানির চিকিৎসার জন্য ১ লাখ টাকা দিলেন। রুবেলকে কাছে নিয়ে বললেন যদি তারপরেও আরো কিছু প্রয়োজন হয় তাহলে যেন তিনি পুলিশ সুপার মো: সৈয়দ নুরুল ইসলামকে জানান।পুলিশ সুপার মো: সৈয়দ নুরুল ইসলাম বলেন, অতীতের তুলনায় আমাদের এখন সমাজের অনেকের আর্থিক স্বচ্ছলতা বেড়েছে।আ এই স্বচ্ছলতা কিংবা পেশাগত জীবনে যদি আপনার কাজকর্ম অন্যের কল্যাণে কাজে না লাগে তাহলে এ জীবনের কোন সার্থকতা নেই।