ডেস্ক রিপোর্টঃ কুমিল্লা নগরীতে বিল্ডিংকোড লংঘন ও প্ল্যানের নির্ধারিতের চেয়ে উপরের দিকে অতিরিক্ত ফ্লোর নির্মাণ এবং বেইজমেন্টে পাকিং ব্যবস্থা বন্ধ করে বাণিজ্যিক কার্যক্রম চালু রেখেছে এমন ৩৩টি বহুতল ভবনের বিরুদ্ধে কঠোর অ্যাকশনে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে সিটি করপোরেশন (কুসিক) কর্তৃপক্ষ। চূড়ান্ত করা এসব ভবন এখন ‘লাল তালিকাভুক্ত’ (রেডলিষ্ট)। কুসিক কর্তৃপক্ষ থেকে একাধিবার নোটিশ দেয়ার পরও ভবন মালিকরা অতিরিক্ত বা বর্ধিত ফ্লোর অপসারণ এবং বেইজমেন্টে গাড়ী পার্কিং সুবিধা চালু করছে না। কুসিক কর্তৃপক্ষ এসব ভবনকে বেআইনি ও অবৈধ হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে।

নগরীকে ঝুঁকি ও যানজটমুক্ত রাখতে ২০১৫ সালের ডিসেম্বরের প্রথমদিকে ২৫টি বহুতল ভবন মালিককে কুসিক মেয়র মনিরুল হক সাক্কু স্বাক্ষরিত নোটিশ দেয়া হয়। নোটিশে বহুতল ভবন নির্মাণের নীতিমালা লংঘন করে প্ল্যানের বাইরে উপরের দিকে অতিরিক্ত ফ্লোর ভেঙে ফেলতে এবং বেইজমেন্ট থেকে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান অপসারণ করার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। এসব ভবন মালিকদের মধ্যে শুধুমাত্র নজরুল এভিনিউ এলাকার ব্র্যাক বেসরকারি জনকল্যাণ প্রতিষ্ঠানের আড়ং শো-রুমে পাকিং ব্যবস্থা চালু করে। আর ২৪ ভবন মালিকের মধ্যে কেউ কেউ সময় চেয়ে মেয়র বরাবর আবেদন করে। কিন্তু ওইসব ভবন মালিকরা নোটিশের তোয়াক্কা না করে সময় নেয়ার অজুহাত দেখিয়ে গত দুই বছর পার করেছে। এরিমধ্যে কুসিকের সার্ভেয়ার শাখার লোকজন নতুন করে আরও ৯টি ভবন লাল তালিকাভুক্ত করেছে। এসব ভবন প্ল্যানের নির্ধারিত ফ্লোর বা তলা ডিঙ্গিয়ে উপরের দিকে ঝুঁকিপূর্ণভাবে ফ্লোর বর্ধিত করেছে। সবমিলে কুসিক কর্তৃপক্ষ নগরীর ৩৩টি ভবনকে লাল তালিকাভুক্তি করে শীঘ্রই অ্যাকশনে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। বহুতল ভবন নির্মাণের আগে নকশায় উল্লেখ ছিল বেইজমেন্টে গাড়ী পাকিং ব্যবস্থা থাকবে। আর নির্ধারিত ফ্লোর অনুযায়ীই ভবন নির্মিত হবে। কিন্তু কাগজে কলমে সব ঠিক থাকলেও বাস্তবে মিলছে ভবনের ভিন্নরূপ। ২০১৫ সালের অক্টোবরের দিকে কুসিক মেয়র মনিরুল হক সাক্কুর নির্দেশে সার্ভেয়ার শাখার লোকজন প্রথম পর্যায়ে এধরণের ২৫টি ভবনের তালিকা করেন। পরে তাদেরকে দুইদফা নোটিশ দেয়া হয়। তারমধ্যে একটি ছাড়া ২৪টিই নোটিশ মানেনি। দ্বিতীয় পর্যায়ের তালিকায় অবৈধভাবে উপরের দিকে ফ্লোর বর্ধিত করেছে এমন আরও ৯টি ভবন যুক্ত করা হয়।

কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের লাল তালিকাভুক্ত বেআইনি ও অবৈধ ভবনের মধ্যে রয়েছে নগরীর প্রাণকেন্দ্র কান্দিরপাড় মনোহরপুর সড়কে ১২তলা বিশিষ্ট ময়নামতি গোল্ডেন টাওয়ার ৯তলার অনুমোদন নিয়ে উপরের দিকে অবৈধভাবে ৩টি ফ্লোর বর্ধিত করেছে। আর বেইজমেন্টের পার্কিংস্থলে দোকানপাট ভাড়া দিয়েছে। পুরাতন চৌধুরী পাড়া টিএন্ডটি অফিসের বিপরীতে জাকির প্যালেস নামে আবাসিক ভবনটি ৮তলার অনুমোদন নিয়ে ১০তলা নির্মাণ করেছে। রাজগঞ্জ পানপট্টি সড়কে কাশেম মসলার মালিক আবুল কাশেম মো. ফজলুল করিম ৯তলার অনুমোদন নিয়ে করেছেন ১০তলা আবাসিক ভবন। শাসনগাছা জাফরখান সড়কের তোফায়েল আহমেদ ৫তলার অনুমতি নিয়ে ৭তলা আবাসিক ভবন নির্মাণ করেছেন। রেইসকোর্স চিশতিয়া মসজিদ রোডের নাজনীন খোরশেদা গং ৬তলার অনুমোদন নিয়ে করেছেন ৭তলা ভবন। একই এলাকার মোজাম্মেল হক গং ৫তলার অনুমোদিত ভবনে করেছেন ৬তলা। পুরাতন চৌধুরীপাড়ায় সৈয়দ মো. জসীম উদ্দিনের অনুমোদিত ৫তলা ভবন এখন ৬তলা। গাংচর থানারোড এলাকার নিজাম উদ্দিন নিজু ৬তলার অনুমোদন নিয়ে করেছেন বাণিজ্যিক ও আবাসিক ৯তলা ভবন। একই এলাকার আমিনুল ইসলাম ৫তলার অনুমোদন নিয়ে বাণিজ্যিক ও আবাসিক ৬তলা ভবন নির্মাণ করেছেন। এ দুটি ভবনের বেইজমেন্টে নেই পার্কিং ব্যবস্থা। আশ্রাফপুর উত্তরের বাসিন্দা লোকমান হোসেন ৩ তলার অনুমোদন নিয়ে করেছেন ৬তলা। দক্ষিণ চর্থার আলী মেহেদী ৬তলার অনুমোদিত ভবন বাড়িয়ে করেছেন ৭তলা।

এদিকে অনুমোদনহীন বর্ধিত ভবনের বাইরেও ২২টি বহুতল ভবনের বেইজমেন্টের পাকিংস্থলে গড়ে গড়ে তোলা হয়েছে বাণিজ্যিক কার্যক্রম। কুসিকের লাল তালিকায় এসব ভবনের মধ্যে রয়েছে মনোহরপুরে সাইবা ট্রেড সেন্টার, বাদুরতলায় কাশ্মিরী হোটেল, নিউ মার্কেট সংলগ্ন এসবি প্লাজা, ঝাউতলায় কিং ফিশার হোটেল, কান্দিরপাড় বিবি সমতট মার্কেট, ঝাউতলায় সামস্যাং মোবাইল ফোন শোরুম ভবন, ঝাউতলায় চিশতিয়া গাউসিয়া ভবন, রানীর বাজারে অ্যাডভোকেট রফিকুল ইসলামের ওষুধ দোকান ও আরএফএল শো-রুম ভবন, রাজগঞ্জে মক্কা টাওয়ার, সদর দক্ষিণে ইউনাইটেড হাসপাতাল ভবন, পদুয়ার বাজার বিশ্বরোডে জাপান কমপ্লেক্স, রেইসকোর্সে আখন্দ জেনারেল হাসপাতাল ভবন, রেইসকোর্সে আজাদ জেনারেল হাসপাতাল ভবন, শাসনগাছা রেইসকোর্সে কমফোর্ট হাসপাতাল ভবন, শাসনগাছা রেইসকোর্সে তৈয়ব আলীর ভবন, শাসনগাছা রেইসকোর্সে আবুল হাসেমের ভবন, শাসনগাছা রেইসকোর্সে কাজী হাবিবুর রহমানের ডেন্টাল হাসপাতাল ভবন, মোগলটুলিতে তানভীর আনোয়ারের আবাসিক ভবন, গাংচরে হাবিবুর রহমানের ভবন, রাজগঞ্জ পানপট্টি রোডে আক্তার হোসেনের ভবন, গাংচরে মোসাম্মৎ মেহেরুন্নেছার ভবন, মোগলটুলি শাহসুজা মসজিদ রোডে ফেরদৌসি আক্তারের ভবন, রাজগঞ্জে মারুফ স্টিল ভবন ও ছোটরা আদালত রোডে ইসলাম সিদ্দিকীর ভবন।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কুসিক মেয়র মনিরুল হক সাক্কু বলেন, ‘কয়েকদিন আগে নগরীর ফুটপাত দখলমুক্তের উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হয়েছে। সামনে দিকে কয়েকধাপে অভিযান চলবে। এরিমধ্যে তালিকাভুক্ত মালিকদেরকে নকশা বহির্ভূত ভবনের অংশ ভেঙে ফেলতে হবে। আর বেইজমেন্ট থেকে ব্যসায়িক কার্যক্রম অপসারণ করতে হবে। অন্যথায় অবৈধ বেআইনি ভবন মালিকদের বিরুদ্ধে কঠোর অ্যাকশন নেয়া হবে। অবৈধভাবে উপরের দিকে ভবন বর্ধিতকরণের বিষয়টি ঝুঁকিপূর্ণ ও বেইজমেন্টে পার্কিং ব্যবস্থা না থাকায় যানবাহন রাস্তার পাশে রাখায় নগরীতে যানজট সৃষ্টি হচ্ছে।’

সূত্রঃ ইনকিলাব

ইউটিউবে আমাদের চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন: