ডেস্ক রিপোর্টঃ বন্ধুরা এমবিবিএস পাস করে বেরিয়েছে অনেক আগেই। কিন্তু মেহেদী হাসান ফারুকের ভাগ্য অতটা সুপ্রসন্ন ছিল না! টানা ১১ বার মেডিসিন বিভাগে পরীক্ষা দিয়েও পাস করতে পারেনি সে। শেষ পরিণতিতে গত ৪ এপ্রিল আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে। মেহেদী কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজের ১৭তম ব্যাচের ছাত্র ছিল। তার মৃত্যুতে বন্ধুমহল এবং চিকিৎসকদের মাঝে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। একইসঙ্গে বইছে প্রতিবাদের ঝড়। কেননা গত চার মাসে এ নিয়ে মোট চারজন মেডিক্যাল শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে।

জানা যায়, মেহেদী হাসান ফারুক ৪ এপ্রিল রাতে তার নিজ বাড়িতে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। তার গ্রামের বাড়ি ঝিনাইদহ জেলায়। কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজের কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তিনি গত ৫ বছর যাবত ফাইনাল প্রফেশনাল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হওয়ার কারণে হতাশায় ভুগছিলেন। তার শুধু মেডিসিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া বাকি ছিল। তাদের ধারণা তিনি হতাশার কারণেই আত্মহত্যা করেছেন।

চিকিৎসকদের ফেসবুক পেজ প্ল্যাটফর্মের অ্যাডমিন ডা. মারুফুর রহমান অপু লিখেছেন, ছেলেটি সম্ভবত আমার ব্যাচমেট বা এক বছরের জুনিয়র ছিল। সবকিছু ঠিক থাকলে সম্ভবত ২০১২ বা ১৩ সালের দিকে এমবিবিএস পাস করে তার ডাক্তার হওয়ার কথা। এখন ২০১৮ সাল, ছেলেটি বিগত পাঁচ বছরে শেষ বর্ষের তিনটি সাবজেক্টের দুইটিতে পাস করলেও একটি সাবজেক্টে (মেডিসিন) ১১ বার পরীক্ষা দিয়েও পাস করতে না পেরে আত্মহত্যা করেছে। আমি এটাকে আত্মহত্যা বলতে রাজি নই। এটি হত্যাকাণ্ড। একটি ছেলে তার এমবিবিএস কারিকুলামের সব পরীক্ষায় পাস করবে কিন্তু একটি সাবজেক্টে ১১ বার পরীক্ষা দিয়ে ৫ বছরেও পাস করবে না এমনটি হওয়া সম্ভব নয়। আর যদি হয়েই থাকে তাহলে তাকে পড়ানোর দায়িত্ব যেসব শিক্ষকদের তাদের দায়ভার নেই কেন? একটি প্রতিষ্ঠান তার ছাত্রছাত্রীদের যদি পাস করার মতো পড়াতে না পারে তাহলে সেই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের কি প্রশ্নবিদ্ধ করা উচিত নয়? পাস করার দায়ভার কি একা শিক্ষার্থীর নাকি প্রতিষ্ঠানেরও দায়িত্ব আছে?

ডা. মারুফুর রহমান অপু বলেন, প্রতিবছরই মেডিক্যাল কলেজের কোনও না কোনও শিক্ষার্থী আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে। এই অবস্থার অবশ্যই পরিবর্তন দরকার। এটি প্রতিরোধে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতা চাই, শিক্ষার্থীদের মানসিক সহায়তা কেন্দ্র চাই, শিক্ষার্থীবান্ধব শিক্ষা ব্যবস্থা চাই।

চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজের নিউরোসার্জারি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ও অধ্যাপক ডা. নোমান খালেদ চৌধুরী আক্ষেপ করে বলেন, ‘একজন ছাত্র ১১ বার একটি বিষয়ে ফেল করলো! কেন করলো? ফেল করার কারণ কি সেই ছাত্রকে বলা হয়েছিল? ১১ বার একজন ছাত্র যদি একটি বিষয়ে ফেল করে এবং ইতোমধ্যে অন্য বিষয়ে পাস করে থাকে তবে যারা পরীক্ষা নিয়েছেন তাদের এবং যারা এই পরীক্ষা ব্যবস্থপনায় জড়িত তাদের কি একবারও পরীক্ষা চলমান সময়ে জবাবদিহিতায় আনা হয়েছিল? আমরা যারা শিক্ষক-পরীক্ষক, তারা কি জবাবদিহিতার উর্ধ্বে? চলমান পরীক্ষা পদ্ধতি কি যথার্থ?’

অধ্যাপক ডা. নোমান খালেদ চৌধুরী বলেন, ‘আমার মতে কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব হবে বিষয়টির সার্বিকভাবে তদন্ত করা। সংশ্লিষ্ট মেডিক্যালের ছাত্রছাত্রীদের আনুষ্ঠানিকভাবে কলেজের অধ্যক্ষ, ডিন- মেডিসিন ফ্যাকাল্টি, বিএমডিসি, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ উপস্থাপন করা উচিত হবে।’

মোহাম্মদ আরিফুল হক নামে একজন ক্ষোভ জানিয়ে ফেসবুকে লিখেছেন, দেশ যেহেতু ডিজিটাল হচ্ছে সেহেতু অন্তত এক বছর পর্যন্ত ভাইবা সেশনের ভিডিও রেকর্ড রাখা সময়ের দাবি।

মেডিক্যাল অফিসার মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান লিখেছেন, এ রকম অনেক উদাহরণ আছে। যেখানে ফেলের পেছনে অন্যের হাত থাকে। দিনাজপুর মেডিক্যালের (বর্তমান নাম এম আব্দুর রহিম মেডিকেল কলেজ) একজন ছাত্র পাঁচ বছরে এনাটমি পাস করতে পারেনি। তার বন্ধুরা এখন ইন্টার্নশিপ করছে। শেষ পর্যন্ত সেই ছেলে পাবনা মেডিক্যালে নিজেকে শিফট করেছে। আশা করা যায় এবার সে এনাটমি পাস করবে…!

এ ব্যাপারে কুমেক উপাধ্যক্ষ ডা. জাহাঙ্গীর আলম ভুইয়া মোবাইলে বলেন, বিষয়টি আমার জানা নেই। আমরা খোঁজ নিচ্ছি। জেনে আপনাদের জানাবো।

ইউটিউবে আমাদের চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন: