বিমা দাবির টাকা পরিশোধে বিভিন্ন কোম্পানির বিরুদ্ধে প্রায়ই হয়রানির অভিযোগ তোলেন সাধারণ গ্রাহক। এবার এ তালিকায় যুক্ত হলেন একজন সংসদ সদস্য। টাকা না পেয়ে এ খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) দ্বারস্থ হয়েছেন তিনি। কুমিল্লা-৮ আসনের এমপি নাছিমুল আলম চৌধুরীর সঙ্গে ঘটেছে এমনটি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, এমপি নাছিমুল ‘বি জে জিও-টেক্সটাইল’-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক। তিনি ২০১৮ সালের ৫ এপ্রিল তার প্রতিষ্ঠানের জন্য ইস্টার্ন ইন্স্যুরেন্স ও নর্দার্ন ইসলামী ইন্স্যুরেন্সের সঙ্গে অগ্নি বিমা (কো-ইন্স্যুরেন্স) করেন।

কো-ইন্স্যুরেন্স হলো একই বিমা একাধিক কোম্পানিতে করা। বড় অঙ্কের বিমার ক্ষেত্রের কো-ইন্স্যুরেন্স করা হয়। এক্ষেত্রে যে কোম্পানিগুলোর সঙ্গে বিমা করা হয়, তাদের বিমার অংশ ভাগ করে দেওয়া হয়।

বি জে জিও-টেক্সটাইল ইস্টার্ন ইন্স্যুরেন্স ও নর্দার্ন ইসলামী ইন্স্যুরেন্সের সঙ্গে অগ্নি বিমা (কো-ইন্স্যুরেন্স) করার তিন মাসের মাথায় ৩ জুলাই প্রতিষ্ঠানটিতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এতে ভবন, মেশিনারি, কাঁচামাল ও উৎপাদিত মালামালসহ বিমা করা সম্পদ ভস্মীভূত হয়।

এ অগ্নিকাণ্ডের ক্ষয়-ক্ষতি নির্ণয় করতে বিমা কোম্পানি থেকে মেসার্স দি ইনজিনিয়ার্স সার্ভেয়ার্স ও মেসার্স মিডল্যান্ড সার্ভেয়ার্সকে জরিপের দায়িত্ব দেওয়া হয়। জরিপকারী প্রতিষ্ঠান দুটির জরিপে ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারিত হয় ৯ কোটি ১৪ লাখ ৮০ হাজার ১৭৯ টাকা।

তবে বিমা কোম্পানি দাবির এ টাকা পরিশোধ করছে না বলে অভিযোগ করেছেন বি জে জিও-টেক্সটাইলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাছিমুল আলম চৌধুরী। সম্প্রতি আইডিআরএর চেয়ারম্যানের কাছে করা এ-সংক্রান্ত লিখিত অভিযোগে তিনি উল্লেখ করেছেন, দীর্ঘ তিন বছর ধরে বিমা কোম্পানি দুটি বিমা দাবির টাকা পরিশোধ না করে টালবাহানা করছে।

অভিযোগপত্রে তিনি উল্লেখ করেছেন, অনেকবার তাগিদ দেওয়ার পর কিছুদিন আগে দুই কিস্তিতে দুই কোটি টাকা পরিশোধ করেছে। ক্ষতিপূরণের বাকি ৭ কোটি ১৪ লাখ ৮০ হাজার ১৭৯ টাকা এখনো পরিশোধ করেনি। সাধারণ বীমা করপোরেশন থেকে ক্লিয়ারেন্স পাওয়ার পর এ অর্থ পরিশোধ করা হবে বলে টালবাহানা করছে।

তিনি আরও অভিযোগ করেছেন, এ পরিস্থিতিতে প্রতিষ্ঠানটি পুনরায় চালু করা সম্ভব হচ্ছে না। ঋণ পরিশোধ করতে না পারায় সুদ-আসলে ব্যাংকের কাছে দায়বদ্ধ হয়ে পড়ছেন তিনি। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা-শ্রমিক মিলে প্রায় দেড়শোর মতো লোক কাজ হারিয়ে বেকার হয়ে পড়েছে।

নাছিমুল আলম চৌধুরী অভিযোগপত্রে আরও উল্লেখ করেছেন, বিমা কোম্পানি দুটি বিমা দাবির টাকা পরিশোধ না করায় গত তিন বছরে তিনি ব্যাংক ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে পারছেন না। এর সঙ্গে সুদও যুক্ত হয়েছে।

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে এমপি নাছিমুল আলম চৌধুরী জাগো নিউজকে বলেন, আমি বিমা করেছি বিমা কোম্পানিতে। এখন তারা আমাকে বলে, সাধারণ বীমা করপোরেশন থেকে তারা কোনো ক্লেম পায়নি। আমি তো সাধারণ বীমা করপোরেশনে বিমা করিনি। অসংলগ্ন কথাবার্তা বলে তারা হয়রানি করছে।

তিনি বলেন, এ বিমা কোম্পানির সঙ্গে আমি কয়েক বছর ধরেই বিমা করছি। তবে এটাই আমার প্রথম বিমা দাবি। এর আগে দুর্ঘটনায় পড়িনি। প্রথমবার বিমা দাবি উত্থাপন হওয়াতেই এমন হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। আসলে বিমা কোম্পানিই খারাপ।

এ সংসদ সদস্যের কথায়, আমার ভাগ্য এমনই খারাপ, চট্টগ্রাম বন্দরে ৯৬ কনটেইনার কাঁচামাল ছিল। তার মূল্য ১৮ কোটি টাকা। সে মালও এখানে নিয়ে এসেছিলাম। সম্পূর্ণ মাল পুড়ে গেছে। কিছুই সরাতে পারিনি।

তিনি বলেন, বিমা কোম্পানির এমডি (মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা) হলেন চোর। টাকা-পয়সা চান। বিমা দাবি পরিশোধের জন্য আকার-ইঙ্গিতে টাকা চান। বলেন, এখানে ঘুষ দিতে হবে, ওখানে ঘুষ দিতে হবে। আমি তো ঘুষ দেবো না।

‘অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে আইডিআরএ আগামী ১৯ সেপ্টেম্বর শুনানির জন্য ডেকেছে। শুনানিতে বিমা কোম্পানিও থাকবে। দেখা যাক কী হয়।’

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলো নর্দান ইসলামী ইন্স্যরেন্সের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল হক জাগো নিউজকে বলেন, এটা (বিমা দাবি) একটা বড় ক্লেম। সাধারণ বিমার সঙ্গে রিইন্স্যুরেন্স করা। সাধারণ বিমা এখনো ক্লেমটা অ্যাপ্রুভ করেনি। ওরা ক্লেম অ্যাপ্রুভ না করলে আমরা দিতে পারি না।

তিনি বলেন, পার্টি (গ্রাহক) অভিযোগ করছে, ক্লেম পাবে। ক্লেম নিষ্পত্তির বিষয়ে আলোচনা হতে পারে। আইডিআরএ আমাদের শুনানিতে ডেকেছে। শুনানিত অংশ নেই, তারপর এ বিষয়ে কথা বলা যাবে।

ইস্টার্ন ইন্স্যুরেন্সের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ হারুন পাটুয়ারির মোবাইল ফোনে জাগো নিউজের পক্ষ থেকে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

ইউটিউবে আমাদের চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন: