বিষাক্ত পানি-বর্জ্যে ভাসছে কুমিল্লার অর্ধশতাধিক গ্রাম

কুমিল্লা নগরীর দক্ষিণাঞ্চলের অর্ধশতাধিক গ্রামের ফসলের মাঠ, নদী-নালা, খাল-বিল ও জলাশয় দুর্গন্ধযুক্ত বিষাক্ত পানি আর বর্জ্যে পরিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। বেশির ভাগ জমিতে ফসল হচ্ছে না। মরে যাচ্ছে নানা প্রজাতির দেশি মাছ। পচা পানির উৎকট গন্ধে বাড়িঘরে বসবাসও দুরূহ হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় এসব এলাকার বাসিন্দারা দিশাহারা হয়ে পড়ছেন।

এজন্য ‘কুমিল্লা ইপিজেডের দূষিত পানি ও কেমিক্যালের বর্জ্য বাইরে প্রবাহিত’ হওয়াকে দুষছেন কুমিল্লা সিটি কর্তৃপক্ষ ও এলাকার লোকজন এবং ইপিজেড কর্তৃপক্ষ ‘সিটির দূষিত পানি ও বর্জ্য ড্রেনের মাধ্যমে গ্রামে প্রবাহিত’ হওয়াকে দুষছেন। এক্ষেত্রে দূষিত পানি-বর্জ্যে লক্ষাধিক মানুষের ক্ষতির দায় নিচ্ছে না কেউ।

নগরীর দক্ষিণাংশের পুরাতন বিমানবন্দর এলাকার ২৬৭ দশমিক ৪৬ একর জমিতে ২০০০ সালের ১৫ জুলাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কুমিল্লা ইপিজেডের উদ্বোধন করেন। বর্তমানে এখানে দেশি-বিদেশি ও যৌথ মালিকানার ৬৬টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান চালু রয়েছে। প্রতিষ্ঠার সময় এখানে কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগার (সিইটিপি) স্থাপন না করায় রাসায়নিক তরল বর্জ্য ড্রেন-খালে প্রবাহিত হয়ে আশপাশের এলাকার কৃষকের জমির ফসল ও খালবিলে ছড়িয়ে পড়ে এবং জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ২০১৪ সালের ৩০ নভেম্বর ইপিজেডে সিইটিপি স্থাপন করা হয়। কিন্তু এর পরও বিষাক্ত তরল বর্জ্যে পরিবেশ দূষণের বিষয়ে ইপিজেড কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপ সন্তোষজনক নয় বলে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ।

গত দুদিন সরেজমিনে ঘুরে জানা যায়, গোমতির শাখা নদী ঘুঙ্গিয়াজুরী খাল হয়ে ছোট-বড় ড্রেন-খালের পানি ডাকাতিয়া নদীতে প্রবাহিত হয়েছে। এসব খালের পানির সঙ্গে রাসায়নিক তরল বর্জ্য নগরীর দক্ষিণ এলাকারবিষাক্ত পানি-বর্জ্যে ১৬ পৃষ্ঠার পর গ্রামগুলোর কৃষি জমি, খাল-বিল, নদী-নালা ও জলাশয়ের পানিতে মিশছে। এছাড়া দুর্গাপুর ও বাতাবাড়িয়া এলাকার দুটি শিল্পকারখানার তরল বর্জ্য এসব এলাকার পানিতে মিশে একাকার হচ্ছে। খাল-বিলে দুর্গন্ধযুক্ত গাঢ় কালো দূষিত পানি আর বর্জ্যের স্তর দেখা যায়। অনেক এলাকায় লোকজনকে নাক টিপে বা রুমাল চেপে চলাচল করতে দেখা গেছে। এ অবস্থায় অর্ধশতাধিক গ্রামের বাসিন্দাদের সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

সদর দক্ষিণ উপজেলার বিভিন্ন এলাকার অন্তত ২৮ জন ভুক্তভোগী নারী-পুরুষ বলেন, ইপিজেড প্রতিষ্ঠার আগেও এসব এলাকার খাল-বিল দিয়ে পানি প্রবাহিত হতো, এলাকার মানুষ মাছ ধরত। এখন কারখানার দূষিত বর্জ্য কৃষিজমি, খাল ও নদে গিয়ে পড়ছে। দুর্গন্ধে অনেক এলাকায় বসবাস করা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ায় বিঘ্ন ঘটছে। দূষিত বাতাসে গাছের পাতা ঝরে মরে যাচ্ছে। নাকে রুমাল দিয়ে হাঁটা-চলা করতে হয়। অনেকে এসব এলাকায় আত্মীয়তাও করতে চায় না। তারা অবিলম্বে সমস্যার সমাধানের দাবি জানান।

স্থানীয় সাবেক এমপি মো. মনিরুল হক চৌধুরী বলেন, ‘ইপিজেডের কলকারখানার দূষিত বর্জ্যে ৩০ কিলোমিটার এলাকার অর্ধশতাধিক গ্রামের পরিবেশ, কৃষকদের জমির ফসল, গাছগাছালিসহ লক্ষাধিক পরিবারের অস্তিত্ব নষ্ট হচ্ছে। এ অবস্থা থেকে রক্ষার জন্য গত ১০ অক্টোবর কুমিল্লা সিটি মেয়রের নিকট স্মারকলিপি দিয়ে ডিসেম্বরের মধ্যে এর প্রতিকারের দাবি জানিয়েছি, কিন্তু এখনো কোনো পদক্ষেপ দেখছি না। এখন এলাকাবাসীকে নিয়ে কঠোর আন্দোলনের বিকল্প দেখছি না।’

কুমিল্লা ইপিজেডের মহাব্যবস্থাপক মো. জিল্লুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, ইপিজেডের কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার ২৪ ঘণ্টা চালু থাকে। আমাদের কলকারখানার স্বচ্ছ পানি বাইরে যায়। এক্ষেত্রে শহরের পানি ও বর্জ্য পাশের বড় ড্রেন দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ইপিজেডের পানির সঙ্গে একাকার হয় বলে এর দায় ইপিজেডের ওপর চাপানো হচ্ছে। সমস্যার সমাধানের বিষয়ে সিটি কর্তৃপক্ষ ও পরিবেশ অধিদপ্তরকে সহায়তা করে যাচ্ছি।

পরিবেশ অধিদপ্তর-কুমিল্লার উপপরিচালক শওকত আরা কলি বলেন, বন পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোস্তফা কামাল ও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ কামরুল হাসানসহ উচ্চ পর্যায়ের একটি টিম সম্প্রতি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শনসহ নমুনা সংগ্রহ করেছেন। এ বিষয়ে আমরা কাজ করছি, আশা করি একটা সমাধানে পৌঁছতে পারব।

কুসিক মেয়র মো. মনিরুল হক সাক্কু বলেন, ‘ইপিজেড প্রতিষ্ঠার শত বছর আগে থেকেই নগরীর পানি ড্রেন-খাল দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। তখন তো ঐ এলাকাবাসীর কোনো অভিযোগ ছিল না। ইপিজেডের রাসায়নিক বর্জ্য ছাড়া নগরীর পানিতে এমন দুর্গন্ধ আসবে কীভাবে? তারা (ইপিজেড) শতভাগ বর্জ্য শোধন করে না বলেই এমনটি হচ্ছে।’

সূত্রঃ ইত্তেফাক

     আরো পড়ুন....

পুরাতন খবরঃ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
১০১১১২১৩১৪
১৫১৬১৭১৮১৯২০২১
২২২৩২৪২৫২৬২৭২৮
২৯৩০৩১  

ফেসবুকে আমরাঃ